ম্যাজিক পেনসিল: গল্প:: সুন্দরবনের রাত - শুভাঞ্জন ব্যানার্জ্জী


সুন্দরবনের রাত
শুভাঞ্জন ব্যানার্জ্জী (বয়স ১৫+)
দশম শ্রেণি, উত্তরপাড়া মডেল স্কুল (উ. মা.)


হিরণ্ময় জেঠু বেশ কয়েকদিন হল আমাদের বাড়িতে রয়েছেন। কয়েকমাস আগে তিনি দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সোজা আমাদের বাড়িতে এসে পৌঁছান। তারপর থেকে এখানেই রয়েছেন। হিরণ্ময় জেঠুর শরীরটা আসলে ভালো নয়। দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেই জ্বরের কবলে পড়েছেন। বেশ কয়েকদিন বিশ্রাম নেওয়ার পর আজ একটু বারান্দায় এসে বসেছিলেন। আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসতেই হেসে বললেন, “এবার এসে থেকে তোমার সাথে বেশি গল্প করতে পারিনি। শরীরটা ভালো ছিল না। তবে আজ অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি। সন্ধ্যার দিকে তোমার বন্ধুদের ডাকবে নাকি? তাহলে একটা গল্প শোনাতে পারি।”
একটু অবাক লাগলহিরণ্ময় জেঠু আমাকে সবসময় ‘তুই’ সম্বোধন করেন। আজ হঠাৎ ‘তুমি’ বলছেন। হয়তো শরীরে ক্লান্তি থাকার কারণে এখনও পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তবে ব্যাপারটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠল। নতুন গল্প! তাড়াতাড়ি ফোন করে অদ্রিজা, সৈকত আর অর্ণবকে জানিয়ে দিলাম সন্ধ্যাবেলা আসতে।
এবার এখানে একটু হিরণ্ময় জেঠুর পরিচয়টা জানিয়ে রাখা দরকারহিরণ্ময় জেঠু সম্পর্কে বাবার দূর সম্পর্কের দাদা। সে অর্থে আমার জেঠু। কিন্তু, বয়সে আমার দাদুর বয়সিই হবেন। তাঁর মাথাভর্তি সাদা চুল আর মুখের বলিরেখাগুলো তার সাক্ষ্য দেয়। হিরণ্ময় জেঠু সারাজীবন শিকার করা ছাড়াও সারা ভারত, বিদেশ ঘুরেছেন এবং সঞ্চয় করেছেন নানান অদ্ভুত ও চিত্তাকর্ষক অভিজ্ঞতা। সেগুলোকেই গল্পের মতো করে শোনান আমাদের। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গিমা এত সুন্দর যে, গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে শুনতে হয়। তাঁর গল্পের ঝুলি অফুরন্ত। তাঁর গল্পের ভক্ত শুধু আমি নই, আমার বন্ধু সৈকত, অর্ণব আর অদ্রিজাও জেঠুর কাছে গল্প শুনতে চলে আসে, যেমন আজ সন্ধ্যায় আসবে। হিরণ্ময় জেঠুর বাড়ি বর্ধমানে, যদিও বছরের বেশিরভাগ সময়টাই তিনি বাড়ির বাইরে কাটান। বছরে অন্তত তিনবার বেড়াতে যান আর কখনও কখনও আমাদের বাড়িতে কাটান। ওঁর জন্য একটা ঘর নির্দিষ্ট করা আছে‌। ওই ঘরে ওঠেন প্রত্যেকবার। হিরণ্ময় জেঠু অকৃতদার মানুষ। ফলে, তাঁর কোনো পিছুটান নেই। আমাদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দার্জিলিং-এ তিনি বহুবার গিয়েছেন, তবুও দু-বছর অন্তর একবার দার্জিলিং যাবেনই। দার্জিলিং-এর প্রতি হিরণ্ময় জেঠুর কিছু একটা দুর্বলতা আছে। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। তাই আর জিজ্ঞেস করিনি কখনওতবে যাই হোক, তাঁকে আমরা প্রত্যেকেই ভালোবাসি। সবথেকে ভালো লাগে তাঁর গল্প উপস্থাপনের ভঙ্গি। আজ সন্ধ্যাতেও নিশ্চয়ই রোমহর্ষক কিছু শুনব...


ঠিক সাতটা বেজে দশ মিনিট হতেই সৈকত, অর্ণব আর অদ্রিজা এসে উপস্থিত হল। ডাইনিং-এর ডিভানে বসে রয়েছি আমরা। আমাদের সামনে একটা ইজিচেয়ারে অর্ধশায়িত অবস্থায় রয়েছেন হিরণ্ময় জেঠু। মা চা আর গরম গরম প্রন কাটলেট দিয়ে গিয়েছে। একটা কাটলেটে কামড় দিয়ে হিরণ্ময় জেঠু বলতে শুরু করলেন...

তোরা তো জানিস, একসময় আমি অনেক শিকার করেছি। কিন্তু, আজ যে সময়ের গল্প বলব, তখন দেশে শিকার নিষিদ্ধ হয়েছে সদ্য সদ্য। প্রথম যৌবনে হাত পাকানোর উদ্দেশ্যে শিকার করলেও পরের দিকে আমি শুধু নরখাদক বাঘই শিকার করতাম। তো শিকার নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার তেমন কোনো দুঃখ ছিল না, বরং চোরাশিকারিদের উপদ্রবের কথা কানে আসায় তাদের উপর বেশ রাগই ছিল আমার। যাই হোক, সময়টা ডিসেম্বর। সেবার বেশ জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল কলকাতায়। একদিন হঠাৎ অমিতাভর চিঠি পেলাম। অমিতাভ আমার কলেজের বন্ধু ছিল। কলেজ থেকে বের হবার পর সেভাবে ওর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। চিঠিটা পেয়ে বেশ ভালোই লাগলপুরোনো দিনের কথাও মনে পড়ল। অমিতাভ লিখেছে -

প্রিয় হিরু,
কেমন আছিস? বহুদিন তোর সঙ্গে দেখা হয়নি। কলেজ পাশ করার পর তো বন্ধুকে ভুলেই গিয়েছিস। কিন্তু, তুই ভুললেও আমি ভুলিনি। আমি এখন সুন্দরবনে পোস্টেড। এখানেই আছি প্রায় একবছর ধরে। আমার এখানে হাতে সময় থাকলে ক’দিনের জন্য চলে আয়। ভালো লাগবে আমার। তাছাড়া তোর সঙ্গে কিছু দরকারও ছিল। দরকারটা কী তা চিঠিতে লিখছি না। তুই যদি এখানে আসিস, তাহলে তখন বলব। তুই যদি আসিস, সত্যিই খুশি হব। ভালোবাসা নিস।
- ইতি অমিতাভ

সুন্দরবন যাওয়াই স্থির করলাম। চিঠিটা পাওয়ার দিনকয়েক পর উপস্থিত হলাম সুন্দরবন। অমিতাভ পেশায় রেঞ্জার অফিসার। অফিসঘর খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। সেখানে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই একজন বেঁটেখাটো লোক আমাকে জানাল, সে এখানে ছোটোখাটো কাজ করে থাকে। অমিতাভ প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছে। ততক্ষণ আমি যেন অপেক্ষা করি। অগত্যা... অফিসে বসে রইলাম। ঘণ্টাখানেক পর অমিতাভ এল। সঙ্গে দুজন অফিসার। ওরা গম্ভীরভাবে কিছু আলোচনা করতে করতে অফিসে প্রবেশ করলেও অমিতাভ আমাকে লক্ষ করেই এগিয়ে এল। দুজনের দেখা হল বহু বছর পরে। অমিতাভকে দেখে ভালো লাগছিল। হেসে বললাম, “তোকে তো রেঞ্জারের ড্রেসে চেনাই যাচ্ছে না। একেবারে নায়ক লাগছে।”
অমিতাভ সপ্রতিভ হয়ে হাসল। আমি বললাম, “তোকে তো এখন তুই তোকারি করা যাবে না। স্যার বলে ডাকতে হবে।”
অমিতাভ চোখ পাকাল। আমি হেসে উঠলাম। কিছুক্ষণ টুকটাক কথাবার্তা হবার পর ও বলল, “এখানে কাছেই আমার কোয়ার্টার। চল, আগে ওখানে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিবি।”
আমি মাথা নাড়লাম। দুজনে চেপে বসলাম জিপে। কিছুক্ষণ পরেই এসে উপস্থিত হলাম অমিতাভর কোয়ার্টারে।


চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে অমিতাভ বলল, “তোর দোনলা বন্দুকটাও এনেছিস দেখছি?”
“হ্যাঁ,” আমি হাসলাম, “এটা সবসময়েই সঙ্গে থাকে। বিশেষত জঙ্গলের দিকে গেলে। আসলে বলা তো যায় না...” - কথাটা সম্পূর্ণ করলাম না। আমার কথার মর্মার্থ যে ও বুঝতে পেরেছে, তা বলাই বাহুল্য।
আমরা বসেছিলাম কোয়ার্টারে। একটু আগে সেই বেঁটেখাটো লোকটা এসে চা দিয়ে গিয়েছে। এখানে বলে রাখি লোকটার নাম রামদয়াল। রামদয়ালের সঙ্গে আলাপ হল। মানুষটা ভালো। চা খেতে খেতেই কথা হচ্ছিল। আমার কথা শুনে অমিতাভ গম্ভীর মুখে বলল, “তাহলে তো ভালোই হল।”
কথাটার মানে ঠিক বুঝতে না পারলেও একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, তুই যে চিঠিতে লিখেছিলিস, এখানে নাকি আমার সঙ্গে তোর কী দরকার আছে?”
“হ্যাঁ, ঠিকই। সে কথাই বলতে যাচ্ছি। শোন তবে...” - বলে চায়ের কাপে শেষ একটা চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখল সে। তারপর বলতে শুরু করল।
“ঘটনার শুরু মাসখানেক আগে। তুই তো জানিস এখন পশু শিকার আইনবিরুদ্ধ। কিন্তু তা হলে কী হবে, চোরাশিকারিদের উৎপাত তো লেগেই রয়েছে। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ছালের প্রচুর ডিম্যান্ড। যাই হোক, মাসখানেক আগে একটা বাঘ চোরাশিকারির গুলিতে আহত হয়। বাঘটার আকৃতি বিশাল। কিন্তু, গুলির আঘাতে বেচারার সামনের একটা পা মারাত্মক জখম হয়। ফলে, খুব স্বাভাবিকভাবেই সে শিকারে অক্ষম হয়ে নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে হানা দিতে শুরু করে। বাঘটা একবার রক্তের স্বাদ পেয়েছে। ফলে, ওকে কাবু করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। আমাদের মধ্যেও কেউ ওকে কাবু করতে পারেনি। বড্ড চালাক। ঠিক বুঝে যায়, ওর উপর কখন নজর রাখা হচ্ছে। সেই বুঝেই পালিয়ে যায়।”
আমি বললাম, “তুই কী আমার সাহায্য চাইছিস?”
“হ্যাঁ,” বলে অমিতাভ।
“বেশ। বাঘটাকে মারতে হবে তো?”
“হ্যাঁ। আমিও থাকব তোর সঙ্গে। শুধু আমাকে একটু সাহায্য করিস। আমরা দুজনে মিলে থাকলে আশা করি ওকে মারা যাবে। এর মধ্যে অনেকগুলো মানুষ মেরেছে ও। তাই, কতকটা বাধ্য হয়েই ওকে মারতে হবে। তোর তো এখন খুব নামডাক এ ব্যাপারে। তাই তোর সাহায্য চাইছি।”
“বেশ। আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু, নিশ্চিত কিছু বলতে পারছি না। বহুদিন একাজ করিনি, ফলে অনভ্যাস হয়ে গিয়েছে।”
অমিতাভ আমার এই কথাটাকে পাত্তাই দিল না। বলল, “এখন আমি যাই। আবার সন্ধ্যার দিকে আসব। আজ রাতেই কিন্তু বের হতে হবে অভিযানে।”
এ কথাটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবুও বললাম, “বেশ।”
“টোপ, মাচা সব রেডি। বাঘটা যে জায়গায় ক’দিন ধরেই হানা দিচ্ছে সেখানে টোপ বেঁধেছি। প্রায় দু-সপ্তাহ ও কাউকে মারতে পারেনি। আসলে, মানুষ এখন অনেক বেশি সাবধানি হয়ে উঠেছে। ফলে, বাঘটা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এই সময়েই সুযোগ। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলছি।”
কথা শেষ করে অমিতাভ বেরিয়ে গেল।


রাত ন’টা। নিজের ঘরে শুয়ে একটা বই পড়ছিলাম। দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠলাম। দরজা খুলে দেখি, অমিতাভ।
“চল।”
“এখন?” আমি একটু অবাক হয়েই বললাম।
আসলে, ভেবেছিলাম অমিতাভ বুঝি একটু রাতের দিকে, চারদিক শুনশান হয়ে যাওয়ার পর বের হবে। সাধারণত রাতের দিকেই শিকার করে থাকি আমি। যাই হোক, আর দ্বিরুক্তি না করে রাইফেল ঝুলিয়ে নিলাম দেহে। তারপর দুজনে মিলে বের হলাম জঙ্গলের উদ্দেশে রাত ন’টা বাজে। চারদিক চুপচাপ। গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা দুজন। আমি মনে মনে বেশ বিরক্ত। জিপের পরিবর্তে অমিতাভ হেঁটে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে দেখে ওর উপর বেশ চটেই ছিলাম। তাই, খুব প্রয়োজন ছাড়া ওর সঙ্গে কোনো কথা বলছিলাম না। অবশ্য অন্ধকারের মধ্যে মাঝে মাঝেই ওর অবয়বটা হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও অন্ধকার একটু ফিকে লাগলে তখন ওর অস্তিত্ব অনুভব করছিলাম। মনের বিস্ময়বোধটাকে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। অমিতাভ বরাবরই খুব গোছানো প্রকৃতির ছেলে। ওর এরকম পাগলামির কারণটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কেন যে এরকমভাবে হেঁটে যাচ্ছি আমরা, সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। অমিতাভ সারা রাস্তাই চুপচাপ রইল। একটু টুঁ শব্দও ওর মুখ থেকে যেন বের হচ্ছিল না।


চন্দ্রালোকিত চরাচর। চাঁদের আলোয় চারিদিক যেন ঝকঝক করছে। এরকম রাতে শিকার করার একটা আলাদা উত্তেজনা আছে। মনের মধ্যে চাপা রোমাঞ্চ জেগে উঠছিল আমার। চাঁদের আলোতেই চোখে পড়ল, জায়গাটায় অসংখ্য গাছ নিস্তব্ধ চরাচরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মতোতাদের পাতা, ডালপালার মাঝে দেখা যাচ্ছিল মাচা দুটি। পাশাপাশি দুটি গাছে মাচার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাছে চড়তে তো আমি বরাবরই অভ্যস্ত ছিলাম। একজন দক্ষ শিকারির এটি অন্যতম বৈশিষ্ট্যদুজনে একই সময়ে দুটি মাচায় চড়ে বসলাম। মাচায় উঠে দেখলাম, শুকনো খাবার আর জল রয়েছে। তাছাড়া বেশ কয়েকটা অতিরিক্ত কার্তুজও রয়েছে। মাচায় ওঠার আগে অমিতাভ বলেছিল, বাঘটা নাকি একটা লোককে আজ আবার ধরেছে। সেই মড়িটাও খুঁজে পেয়েছিল ও, বেলার দিকে। ঠিক এই গাছটার নীচেই পাওয়া গিয়েছিল বাঘের মড়িকে। মড়ির কাছে বাঘ ফিরে আসবেই। ফলে, বাঘটাকে শিকার করার উপযুক্ত সুযোগ পাওয়া গিয়েছে।
মাচায় উঠে বসার পর বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে। শিকার করার জন্য ধৈর্য্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর ততদিনে সে ব্যাপারটা ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছি আমি। ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর একটু ঝিমুনি মতো এসেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই সচকিত হয়ে উঠলাম। চারপাশ যেন হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে অনেক বেশইকী ব্যাপার? তখনি একটা গর্জনের শব্দে নিশ্চিত হয়ে গেলাম, তিনি আসছেন। অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকলাম চুপ করে। বন্দুক প্রস্তুত করে নিঃশব্দে রইলাম। একটু পরেই স্তব্ধ চরাচরের মাঝে প্রবেশ করল প্রাণীটি। তাঁর সামনের একটা পা খোঁড়া, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সে। একটা বুনো গন্ধে চারিদিক ভরে গিয়েছে। অমিতাভর কথামতো আমার গাছের কাছেই মড়িটা রয়েছে। উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। বাঘটা ধীরে ধীরে একসময় এসে পৌঁছোল গাছটার নীচে। উপরে আমি বন্দুক নিয়ে বসে রয়েছি। চারদিক স্তব্ধ‌। গাছের নীচে জমা অজস্র পাতা, ডালের মধ্যে থেকে মড়িটাকে ধীরে ধীরে বার করল বাঘটা। আমি বন্দুক তাক করলাম। অন্ধকারেও বন্দুক চালাতে আমার খুব একটা সমস্যা হয় না। মাংস খাওয়ার চপচপ শব্দ ভেসে আসছিল নীচ থেকে। শব্দ লক্ষ করে গুলি চালালাম আমি। অব্যর্থ লক্ষ্য। একটা মরণ আর্তনাদ করে উঠল প্রাণীটি। তাঁর পড়ে যাওয়ার শব্দ কানে আসতেই নিশ্চিত হতে পর পর আরও দুটো ফায়ার করলাম। কোনো শব্দ ভেসে এল না আর‌। বুঝলাম, বাঘটার ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে। গর্বের হাসি হেসে গাছ থেকে নেমে এলাম। অমিতাভও নিশ্চয়ই নেমে এসেছে এতক্ষণে। নীচে নেমে বাঘটার মৃতদেহের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু, অমিতাভকে কোথাও দেখতে পেলাম না। কোথায় গেল ও? চিন্তাটা মাথার মধ্যে এলেও তখন শিকারের উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে আমার। তবুও যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করে এগোলাম বাঘের মৃতদেহের দিকে। তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমর থেকে টর্চ বের করলাম। টর্চের আলো জ্বালাতেই বাঘটার অবয়ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে। কিন্তু, তখনি একটা দৃশ্য চোখে পড়ে গেল আমার। আর তা দেখেই সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। বাঘটার দেহের ঠিক পাশেই পড়ে রয়েছে মড়িটা। দেহটা আধখাওয়া ও বিকৃত হলেও তার মুখটা দেখে চিনতে অসুবিধা হল না। অসুবিধা হল না তার জামাটার কথা মনে করতেও। জামাটা অমিতাভর, যেটা পরে কয়েকঘণ্টা আগে ও কোয়ার্টারে এসে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।”

গল্প শেষ করে থামলেন হিরণ্ময় জেঠু। ঘরে তখন অপার বিস্ময়ে সকলে বসে রয়েছি।
----------
ছবি - মেটা এআই

No comments:

Post a Comment