
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দিবস
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী
গ্রামে আমার বড়োমামা একটা বিদ্যালয়
স্থাপন করেছে।
বড়োমামা বলল, “চল যাবি? আজ প্রতিষ্ঠা
দিবস। তুই বক্তৃতা দিবি, আমি ওদের আগেই
বলে রেখেছি।”
আমি অবাক হলাম, বক্তৃতা আগে
কখনও দিইনি, বক্তৃতা
শুনলেও আমার বড্ড ঘুম পায়। কিন্তু
বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ এর আগে পেয়েছি বলে মনে পড়ছে না। এক আমাদের
স্কুলের অংকের দিদিমণি স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার দিনে ‘বিদায়’ কবিতাটা খুব
খুশি খুশি মুখে উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলাম।
পরে আমাদের ফার্স্ট বয় স্টেজে
উঠে একই কবিতা কেঁদে কেঁদে পড়ে আমার পারফর্মেন্সটাই মাটি করে দিয়েছিল।
ক্লাস নাইন হয়ে গেল, আমি কোনোকালেই
বড়ো একটা স্কুল-টুল যেতে ভালো-টালো বাসি না।
কিন্তু এটা কিনা মামার স্কুল, মানে মামার বাড়ির
আবদার। এখানে বেশ নিজেকে কেউকেটা মনে করে যাওয়া
যাবে, কোনো
প্রতিদ্বন্দ্বীও নেই। আমি শ্র্রী অপূর্ব
বসু একমেব অদ্বিতীয়ম।
আমি বেশ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আর খাওয়াদাওয়া?”
বড়োমামা শিঙাড়া আর পান্তোয়ার আশ্বাস
দিল। তাছাড়া পাশের ভবাদার দোকানের ডালপুরি, জিলিপিটাও দারুণ। এই সমস্ত
আশ্বাস বিশ্বাসে ভর করে আমি সকাল আটটায় কষ্ট করে উঠেই পড়লাম।
একখানা ভ্যানগাড়িতে চেপে প্যাচপেচে
কাদার মধ্যে দিয়ে নাচতে নাচতে হাড়গুলো সব ভাজা ভাজা হয়ে গেল। তখন
আমি নিজেকে মনে করালাম মহাপুরুষরা শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কত কষ্টই না করেছিলেন।
তারপর স্কুলে ঢুকতেই আমাদের কপালে
চন্দন দিয়ে বরণ করে নেওয়া হল।
আমি আমার নাগরা জোড়া পায়ে ঘরে
ঢুকতে যেতেই ক্লাস সিক্সের এক এইটুকুনি পাকা ছোকরা আমাকে বাধা দিয়ে বলল, “ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন।”
আমার জুতোজোড়ার দিকে ইশারা করল। আমিও
বেশ কায়দা করে
“ফরগেট, ফরগেট” বলে জুতো খুলে
এগিয়ে গেলাম।
প্রদীপ জ্বালিয়ে সমবেত কণ্ঠে ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়
ধুইয়ে দাও’ হতেই
বড়োমামা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে খুব ছলোছলো চোখে আর আবেগ জড়ানো গলায় ইংরেজ শাসন থেকে ভারতের
স্বাধীনতা, এমনকি
আন্দামানের জেল অবধি কিছুই বাদ দিল না। তায়
আবার সব সাল তারিখ কাগজে লিখে এনেছে।
ছোটো ছোটো বাচ্চারা আর তাদের বাবা
মায়েরা দশ মিনিট ধরে হাততালিই দিয়ে গেল।
তারপর এক মাস্টারমশাই আমার দিকে
তাকিয়ে নরম হেসে সুর করে বললেন, “এবার বক্তৃতা, শ্রী কেবলচন্দ্র।” শুনে সবাই তো
হো হো করে হেসে অস্থির।
আমি আর নিজের জায়গা ছেড়ে উঠছি
না। মনে মনে এত রাগ হচ্ছে মামার ওপর। আমাকে
সারা পৃথিবীতে কেবল বড়োমামাই কেবল বলে ডাকে, তা বলে ওই নামটা লেখাতে হবে!
“কেবলচন্দ্র,” এবারে মাস্টারমশায়
সুর চড়ালেন উচ্চগ্রামে।
তারপর মামা আমাকে একটা চিমটি দিয়ে
বলল, “কেবলু
যা, ডাকছে।”
আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে বললাম, “নমস্কার, আজ আমাদের স্কুলের
প্রতিষ্ঠা দিবস, স্কুল
একটা ভীষণ দরকারি জিনিস। পড়াশোনা একটা
অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস। শিক্ষকতা খুব
মহৎ কাজ। এই মহৎ কাজকে সফল করার জন্য...”
হঠাৎ বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল “বোঁদে”, কেউ বলল “ডালপুরি”।
তারপর হুড়মুড় করে সবাই দরজা দিয়ে
বাইরে ছুটল।
আমার এই মহৎ বক্তৃতাকে আর কেউ
সফল হতে দিল না।
হাত টেনে মামা বলল, “আরে এদিকে
আয়, নইলে আর একটাও ডালপুরি আস্ত থাকবে না।”
বাইরে চটির সমুদ্র থেকে আমার নাকতোলা
নাগরাটা উদ্ধার করতে গিয়ে দেখলাম, তার একটাকে পাশের খালের জলে নৌকো করে ভাসিয়েছে ক্লাস টু-এর
এক পুঁচকে ছেলে।
তক্ষুনি মনে হল কান ধরে একটা দিই
কষিয়ে। কিন্তু তার হোমড়াচোমড়া বাবাটাও তো পাশে
দাঁড়িয়ে আছে। তাই দাঁত বের করে বললাম, “আমার জুতোটা!”
তারপর কোনোমতে ভেজা জুতোটা উদ্ধার
করে যেই পরতে যাব দেখি নৌকোটা যাত্রীবিহীন ছিল না। মর্কট
একখানি কর্কট ঢুকিয়েছে,
বেরিয়ে এল খচমচ করতে করতে।
‘ডিসিপ্লিন’ ছোকরা এগিয়ে এসে হাত
দেখিয়ে বলল,
“দিস ওয়ে প্লিজ।”
বললাম, “ইউ গো, আই কাম সুন।”
টিচার্স রুমে গিয়ে বসলাম। সেখানে
আলোচনা হচ্ছে স্কুলে মূর্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে। স্কুল
হল আর স্কুলে অনুপ্রেরণাদায়ী মূর্তি হবে না? কিন্তু কার মূর্তি? এই নিয়েই আলোচনা
চলছে।
কথাকলি ফার্নিচারের মালিক তো প্রায়
ঠিকই করে ফেলেছেন কার মূর্তি বসবে। কিন্তু
টিচাররা মাথা নাড়ছেন।
তারপর আমার দিকে তাকিয়েই হেডমাস্টারমশাই
প্রশ্ন করলেন, “বাবু
কেবলচন্দ্র, তোমার কী মনে হয়?”
আমি তখন সদ্য আসা ডালপুরিখানা
পান্তোয়া দিয়ে পাকিয়ে গালে পুরেছি। চোখ
বন্ধ করে তাই চিবোতেই ব্যস্ত।
এই কথায় চোখ কপালে তুলে বললাম, “রাম...”
শুনে হেডমাস্টার ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “রামচন্দ্র?”
পাশ থেকে আরেকজন বললেন, “রামকৃষ্ণ? যত মত তত পথ...”
বাংলার স্যার বললেন, “রামপ্রসাদের
কথা বলছে।”
ইংরেজি স্যার বললেন, “আরে ও বলছে
রামমোহনের কথা। নবজাগরণের পথিকৃৎ।”
এক দিদিমণি কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “রামেশ্বর স্বামীর
কথা বলছে, আমার
গুরুদেব। টালিগঞ্জে থাকতেন।”
ইতিমধ্যে আমার গলায় পান্তোয়ার
রস আটকে সে কী বিষম হিক্কা উঠল।
সবাই তো “হায় কী হল, হায় রাম” করে হুলুস্থুল
বাঁধিয়ে দিল।
স্কুলের দারোয়ান, ইয়া পেল্লাই
চেহারা, এগিয়ে
এসে বলল, “ই সব
আমি ঠিক করিয়ে দিব, কুনো
চিন্তা নাই...”
মুগুর তোলা হাতে পিঠে মারল এক
চাপড়।
পান্তোয়া সোজা মুখ থেকে বেরিয়ে
ছিটকে হেডমাস্টারের চায়ের কাপে।
বড়োমামা দাঁত কিড়মিড় করে আমার
দিকে তাকিয়ে বলল,
“রামছাগল!”
----------
ছবি - স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
অল্প শব্দে দারুণ মজার গপ্পো! দিব্যি লেগেছে।
ReplyDelete