
এক চোরের গল্প
প্রতীক কুমার মুখার্জি
খুনখারাপি রঙের তেলে মাখামাখি আচারটা দিয়ে মোটাসোটা তিনটে আলুর পরোটা জমিয়ে
সাবাড় করে, ঝালের চোটে শিষোতে শিষোতে হটপটের
কন্টেনার গোছাচ্ছিলেন অরুণাংশুবাবু। প্যাকিং
শেষ হলে, লাঞ্চব্যাগ থেকে একটা পুঁচকে কন্টেনার বার করে নিয়ে প্রথম সরভাজাটা সবে
মুখে পুরতে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তক্ষুনি, ডেস্কের উপরে তাঁর ফোনটা ম্যালেরিয়ার রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করল! বিরক্ত মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই তিনি দেখেন, কলটা আসছে বিনীর স্কুল থেকে। ফোনটা করছেন
স্বয়ং প্রিন্সিপাল ম্যাডাম!
একবার ফোনের দিকে, আর একবার হাতে ধরা প্রিয় মিষ্টির দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে
নিয়ে অরুনাংশুবাবু কিছুটা নিরুপায় হয়েই বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে কলটা অ্যাক্সেপ্ট করে,
স্পিকার অপশনে দিয়ে দিলেন। ওদিক থেকে ভেসে এল মিসেস
সান্যালের গম্ভীর আওয়াজ, “গুড আফটারনুন, অ্যাম আই টকিং টু রুদ্রাণী রয়েজ ফাদার, মি: অরুণাংশু রয়? রুদ্রাণী রয়
ফ্রম ক্লাস ওয়ান, সেকশন সি?”
ঝালে জ্বলতে থাকা অবস্থাতেই একটা ঢোঁক গিলে, নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে চটজলদি
সামাল দিলেন বিদেশি ব্যাংকের সিনিয়ার ম্যানেজার
রায়বাবু, “ইয়া, অফ
কোর্স ম্যাম। গুড আফটারনুন! রয় দিস এন্ড! প্লিজ
টেল মি!” ঠিক সেই সময়েই,
ফোনের স্ক্রিনে আরেকটা নম্বর ভেসে ওঠে - বাড়ির
ল্যান্ডলাইন নম্বর!
“উইথ ডীপ রিগ্রেট মি: রয়,
দিস ইজ টু ইনফর্ম দ্যাট দেয়ার হ্যাজ বিন আ সিচ্যুয়েশন অ্যাট স্কুল টুডে ইনভলভিং
ইয়োর ওয়ার্ড, রুদ্রাণী! উই এক্সপেক্ট বোথ দ্য পেরেন্টস অ্যাট দ্য প্রিন্সিপাল’স অফিস - এস্যাপ! এটা একটা ছোটো ঘটনা হলেও, এতে স্কুলের ইমেজ
ইনভলভড! আমরা আপনাদের অপেক্ষায় রয়েছি!”
ফোনটা কেটে যাওয়ার আগে, অরুণাংশুবাবু
আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করতে পারলেন, “এনি
অ্যাক্সিডেন্ট ম্যাম? বিন... আই মীন রুদ্রাণী ঠিক আছে তো? ইজ শি সেফ?” ভদ্রমহিলার গাম্ভীর্য একটুও
টসকায়নি। “ইয়েস মি: রয়, নো ওয়ারিজ রিগার্ডিং দ্যাট! শি’জ
অ্যাবসলিউটলি ফাইন! সি ইউ!” ওদিক থেকে ফোনটা কেটে দেওয়া হল!
কন্টেনারের মিষ্টি কন্টেনারে রেখে, কেবিনের ওয়াশরুম থেকে চটজলদি হাত ধুয়ে আসতে না আসতেই, বাড়ির ফোনটা আবার সপাটে আছড়ে পড়ল অরুণাংশুবাবুর ফোনে। “হ্যাঁ, সুজাতা, বলো!”
তাঁর স্ত্রীর গলা তখন উত্তেজনায় কাঁপছে, “হ্যালো, হ্যালো! শোনো না, বিনীর স্কুল
থেকে ফোন এসেছিল - প্রিন্সিপালের ফোন। এক্ষুনি
ডাকছে স্কুলে। কী হয়েছে জানি না!” অরুণাংশুবাবু টিস্যু দিয়ে
মুখ মুছতে মুছতে ঠান্ডা গলায় বলেন, “কুল
ডাউন, রুদ্রা... মানে, বিনী ঠিক আছে। তুমি স্কুলে ঢোকো, আমিও বেরোচ্ছি
এক্ষুনি!”
“তোমাকেও ফোন করেছিলেন ম্যাম?” সুজাতার
গলা কেঁপে যায়। “কী জানি মেয়েটা আজ কী করল
আবার - নিশ্চয় কিছু একটা করেছে - নইলে এরকমভাবে তলব করে? ওকে এবার নিশ্চয় স্কুল
থেকে রাস্টিকেট করে দেবে... আমার যে কী জ্বালা! এইটুকু বয়সে এত পেকে গিয়েছে! ক্লাস
ওয়ানেই উনি সবজান্তা হয়ে গিয়েছেন! সব কিছুতে ডেঁপোমি! ফিরুক বাড়িতে!” গিন্নির শব্দটা ওঠাপড়া করতে থাকে, অনেকটা
ডলবি সারাউন্ড সাউন্ড এফেক্টের মতোই। বার দুয়েক ‘সুজাতা! সুজাতা!’ করে ডাকাডাকির পরে তাঁর
সাড়া না পেয়ে অরুণাংশুবাবু বোঝেন, স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতেই তাঁর গিন্নি এইসব
কথা নিজেই আওড়ে চলেছেন! এমনকি, উত্তেজনার
বশে কলটা কাটতেও ভুলে গিয়েছেন তিনি!
চিন্তা যে তাঁরও হচ্ছিল না, তা নয়! উৎকন্ঠায় বুক থেকে উঠে আসা একটা বিশাল
দীর্ঘশ্বাস বুকেই চেপে, অরুণাংশুবাবু
তাঁর কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ঠিক
তখনই, ঢাকা খোলা খুদে কন্টেনারের দেয়াল বেয়ে একটা
ছোট্ট কালো পিঁপড়ে উঠে পড়ে, মিষ্টি দুটো
দেখে যেন পরম পুলকে তার ছোট্ট কালো মাথাটা উপর নীচ করতে থাকে!
মনে কতটা দুশ্চিন্তা নিয়ে, শহরের দু-দিক থেকে দুজনে কীভাবে সাহেবপাড়ার জাঁদরেল কনভেন্ট
স্কুল ‘সেন্ট সলোমনসে’
পৌঁছেছিলেন, তা বলে আর তোমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নাই নিলাম!
তাই ভালো, চলো আমরা সোজাসুজি পৌঁছে যাই প্রিন্সিপালের অফিসে,
যেখানে এই মুহূর্তে কিছু মানুষ অত্যন্ত গম্ভীর মুখে একজোট হয়েছে - প্রিন্সিপাল
সান্যাল ম্যাডাম, স্কুল সেক্রেটারি মিসেস ভারগ্যাঞ্জা, মেন্টর ইন চার্জ মি: রনি,
অরুণাংশুবাবু আর শ্রীমতী সুজাতা রায়।
দেখেছ, ওই ঢাউশ মাপের ঘরটাতে আর যে দুজন
ছিল, তাদের কথা বলতেই ভুলে গিয়েছি আমি! ক্লাস ওয়ানের রুদ্রাণী রায় ওরফে বিনী, আর তার ক্লাসেরই সিবাস্টিয়ান ফিলিপস। দুজনের মুখই ব্যাজার, কাঁদো কাঁদো অবস্থা!
ঘটনাটা প্রথমে শুনে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন অরুণাংশুবাবু ও সুজাতা। ক্লাসের দুষ্টু ছেলে ফিলিপস নাকি
সেদিন একটা ঝকঝকে নতুন কুড়ি টাকার কয়েন নিয়ে স্কুলে এসেছিল। সেটি সে টিফিনের সময় সব্বাইকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায়! তারপর সেটা হারিয়ে ফেলে
যথারীতি তার সামনের ডেস্কে বসা রুদ্রাণীর উপরে
সমস্ত দোষ চাপিয়ে, ক্লাস টিচারকে নালিশ করে। তার
বক্তব্য অনুযায়ী, টিফিনের সময় রুদ্রাণী নাকি সেটা হাতে নিয়ে দেখতে চেয়েছিল, ফিলিপস দেয়নি। দুটো পিরিয়ড পরে, ফিলিপস সেই
কয়েন নিজের পেনসিল বক্সে আর খুঁজে পায়নি।
এই পর্যন্ত শুনেই বাঁ
হাতের আঙুল দিয়ে নিজের নাকটা চুলকে নিয়ে, ঠান্ডা গলায় অরুণাংশুবাবু প্রিন্সিপাল ম্যাডামের চোখে চোখ রাখেন, “টু থিংস ম্যাম! ফার্স্টলি, বাচ্চাদের কি
জুনিয়র ক্লাসে কারেন্সি, ইন এনি ফর্ম, নিয়ে আসা অ্যালাওড? অ্যান্ড, কয়েনটা কি বি... আই মীন রুদ্রাণীর কাছ থেকে পাওয়া গেছে? জাস্ট টেল মি দিস!”
“ও নো! দ্যাটস নট দ্য ইস্যু, মি: রয়!” প্রিন্সিপাল ম্যাডামের গাম্ভীর্যে
যেন একটু ভাঁটা পড়ে! “ইউ আর অ্যাবসলিউটলি রাইট! নো কিড
ইজ সাপোজড টু ক্যারি কারেন্সি টু
স্কুল। সেকেন্ডলি, খোঁজার পরে কয়েনটা
পাওয়া যায় রুদ্রাণীর শ্যুউয়ের নীচে, ফ্লোরের উপরে। শি’জ নো থিফ - ও কমপ্লিটলি ইনোসেন্ট - ও জানতই না, সেটা কখন ওর জুতোর নীচে শেল্টার নিয়েছে!”
“দেন, ইজ দিস আ জোক ম্যাম? দিজ আর
ইনফ্যান্টস, আফটার অল!” ফিলিপস নামের বাচ্চাটার দিকে আগুনে চোখে
একবার তাকিয়ে নিয়ে, উত্তেজিত হয়ে শ্রাগ করলেন অরুণাংশুবাবু! “অ্যাজ ইউ সে, মাই গার্ল ইজ ইনোসেন্ট! দেন হোয়াই দিস আননেসেসারি
হ্যারাসমেন্ট? ইউ নো দ্য হোল স্টোরি - হোয়াই
অ্যাকিউজ মাই প্রিন্সেস?” রোখ চেপে গেছে
অরুণাংশুবাবুর! তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই যেন
নাকের পাটা ফুলতে শুরু করেছে সুজাতার - চোয়ালের হাড়দুটো দ্রুতবেগে ওঠা নামা করছে।
“হোল্ড ইট, হোল্ড ইট স্যার!” স্কুল
সেক্রেটারি মিসেস ভারগ্যাঞ্জা মুখ খুলেছেন এবার! “এভরি স্টেপ হ্যাজ বিন টেকেন, মি: রয়! দ্য
বয়েজ পেরেন্টস হ্যাভ বিন ইন্টিমেটেড, ওকে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য সাসপেন্ড করা হবে৷ ওকে এখানে ডাকা হয়েছে, যাতে ও আপনাদের ও গভর্নিং বডির সামনে
নিজের দোষ স্বীকার করে রুদ্রাণীর কাছে ফরগিভনেস চেয়ে নেয় - ইন দ্য নেম অফ দ্য হোলি
লর্ড! আমরা এটা অন রেকর্ড মেইনটেন করব! এক্সেমপ্লারি অ্যাকশন হিসেবে!”
“তাহলে আমার মেয়েকে নিয়ে আপনাদের সমস্যাটা কোথায় জানতে পারি?” প্রথমবার মুখ খুলেছেন সুজাতা! মেয়ের কোনো দোষ নেই জানার পরে, তিনি আর কী করেই বা
মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন? স্বামীর পোশাকি সফিস্টিকেশন তাঁর নেই - কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী তো তিনিও নন!
“এক্সকিউজ মি ম্যাম, ফিলিপসের
ইস্যুটা জাস্ট নাথিং। এসব ছোটোখাটো ব্যাপার বাচ্চাদের মধ্যে ইউজুয়াল! বাট আপনার ডটার হ্যাজ আ সিরিয়াস প্রবলেম!” আধা ইংরেজি আধা বাংলায় বলা এই কথাগুলো উড়ে এল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেন্টর মি: রনির মুখ থেকে। “ফার্স্ট লেট’স ফিনিশ অফ উইথ দ্য চিলড্রেন, দেন উই ডিসকাস দ্য রেস্ট!”
গোঁজমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছয় বছরের বিনীর দিকে বারদুয়েক আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে, দু-বারের
চেষ্টায় মাথায় সজারুর কাঁটার মতো চুলের
গাঁট্টাগোট্টা বাচ্চা ছেলেটা শেষ পর্যন্ত বলল, “বিলিভ মি রুডি, দিস ওন্ট বি রিপিটেড! ফ্রেন্ডস আগেন, রাইট? রাইট?” তৃতীয়বারে
বিনীর মুখে হাসি ফুটল! তারপরে মেন্টর রনিবাবু তাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ওরা প্রিন্সিপালের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পরে, ঘরের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু
করল আবার! সান্যাল ম্যাডাম অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে অরুণাংশুবাবু ও তাঁর স্ত্রীকে
বুঝিয়ে দিলেন, সেদিন ক্লাসে যখন কয়েনটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, ফিলিপসের
নালিশের জেরে ক্লাস টিচার নাকি রুদ্রাণীকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হ্যাভ ইউ টেকেন ফিলিপস' কয়েন, রুদ্রাণী?”
বার বার জিজ্ঞেস করার পরেও, রুদ্রাণী চুপচাপ
মুখ বুজে দাঁড়িয়েছিল। ক্লাস টিচারের
ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে, শেষে তিনি রেগেমেগে রুদ্রাণীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, “হ্যাভ ইউ স্টোলেন দ্য কয়েন?” তাঁকে
হতবাক করে দিয়ে রুদ্রাণী মাথা ঝাঁকিয়ে বিশুদ্ধ বাংলাতেই বলে ওঠে, “হ্যাঁ মিস, আমি মহাচোর! আমার
বাড়িতে সব্বাই চোর! আমরা চোরের বংশ! আসলে আমরা গুষ্টিশুদ্ধু চোর! আমরা সবাই প্রতিদিন চুরি করি!”
এই পর্যন্ত শুনেই অরুণাংশুবাবু ও সুজাতা ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন! তাঁদের চোখ মেয়ের দিকে - যে নির্বিকার মুখে
তাকিয়ে রয়েছে বাবা ও মায়ের দিকে! তাঁদের মুখে খেলা করতে থাকে অবিশ্বাস, অপমান,
রাগ, দুঃখ, ক্ষোভের
পাঁচমিশালি রামধনু! তাঁদের কানে ঢুকতে থাকে সান্যাল ম্যাডামের চিবিয়ে চিবিয়ে বলা
কথাগুলো, “সো মি: রয়, লুক অ্যাট ইয়োর
রিঅ্যাকশন! এই নামকরা স্কুলের কোনো স্টুডেন্ট, ক্লাসের বাচ্চাদের সামনে বাংলায়, ইয়েস বাংলায় এভাবে কথাগুলো কীভাবে
বলতে পারে? আই থিংক ইট ইজ আ সিরিয়াস প্রবলেম! ইউ
নিড টু ডিল উইথ ইট ভেরি কেয়ারফুলি!”
সুজাতা, সম্ভব হলে সেখানেই মেয়ের গায়ে হাত
তুলে দিতেন! মেয়েটা সোজাসাপটা কথা বলে কথা ফোটার সময় থেকেই, কিন্তু তা বলে এই?
মাত্র ছয় বছর বয়স ওর! নিষ্ফল আক্রোশে পুড়তে পুড়তে হতাশ হয়ে তিনি যখন চেয়ারে বসে
পড়েন, তখন তাঁর দু-চোখ বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে
জলের ফোঁটা! অন্যদিকে, অরুণাংশুবাবু শূন্য
দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। তাঁর মুখ
এক্সপ্রেশনলেস! শুধু বাবা ও মেয়ের চোখদুটো একে অপরের দিকে নিবদ্ধ!
বাবাকে এভাবে দেখতে পারে না বিনী! বাবা চোখ নামিয়ে নিয়ে, আস্তে আস্তে মায়ের
পাশে চেয়ারে বসে পড়ে, মাথাটা বুকের কাছে ঝুলে পড়েছে তখন! ঘরে একটা পিন পড়লেও সেটা চকোলেট বোমের আওয়াজ করবে। প্রিন্সিপাল, স্কুল সেক্রেটারি এবং
ইতিমধ্যেই ঘরে ফিরে আসা মেন্টরের মুখেও টুঁ শব্দ নেই। মিনিট পাঁচেক পরে, বাবা মুখ তুলে নিঃশব্দে প্রিন্সিপালের দিকে তাকাতে পারল! বাবার হাতদুটো বুকের কাছে জড়ো করা!
বাবার মুখে যেন কেউ কালি লেপে দিয়েছে, চোখের কোলে জল! মা তো কখন থেকেই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে চলেছে! কেউ কোনো কথা
বলছে না। কেউ কথা বলার অবস্থাতেই নেই। ঠিক তখনই, সকলে চমকে ওঠে একটা কচি গলার আওয়াজে! কান্নার গমকে গমকে রুদ্রাণী
ওরফে বিনী নিজের সাফাই পেশ করছে -
“ও মিস! ও স্যার! কী ভুল
বলেছি আমি? আমার কী দোষ? ঠাম্মাই তো বলে, আমরা
সব্বাই চোর! আমাদের গুষ্টিশুদ্ধু চোর! আমরা
চোরের বংশ! আমরা প্রতিদিন চুরি করি!” ঘরের
বাকি সবাই যেন সেই মুহূর্তে চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেয়ে চেয়ার থেকে ছিটকে উঠে
দাঁড়িয়ে পড়ে!
রুদ্রাণী ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে
থাকে, “ঠাম্মাই
বলেছে, তোর দাদুর সুগার, মিষ্টি
খাওয়া বারণ - কিন্তু আমি জানি, সে পাড়ার হালদার সুইটসে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে রোজ
মিষ্টি খেয়ে আসে! আমি? আমি দাদুর পানের ডিবে থেকে রোজ একটা করে জর্দা পান চুরি করে
খাই! তোর বাবা এখনও আমাকে লুকিয়ে চুরি করে সিগারেট খায় - কতদিন ধরে ফেলেছি! তোর মা - সে আমাকে
নিজে বলেছে, তোর বাবার পকেট থেকে রোজ টাকা
সরিয়ে অনেক টাকা জমিয়ে ফেলেছে এর মধ্যে! আর তুই? তুই তো মহাচোর! সুযোগ পেলেই ফ্রিজ
থেকে, ডাইনিং টেবিল থেকে এটা ওটা চুরি
করে খেতেই থাকিস! তাহলে বল তো দিদি - আমরা সবাই চোর নই? আমাদের গুষ্টিশুদ্ধু চোর! আমরা চোরের বংশ!”
এর পরে কী হয়েছিল বা কী হতে পারে, তা বুঝে নেওয়ার ভার
তোমাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম। শুধু
একটা কথা না বললে চলবে না, তাই বলছি
- রুদ্রাণী তার কথা শেষ করার আগেই, সে অবাক হয়ে দেখে ঘরের মধ্যে প্রত্যেকের মুখে
হাসির রেশ ফুটে উঠে সেটা অট্টহাসিতে বদলে যেতে মাত্র সেকেন্ড আটেক সময় লাগল!
বাবা ছুটে এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে দু-পাক ঘুরে গেল - তাঁর মুখে হাসি! প্রিন্সিপাল ম্যাম যে ওরকম শব্দ করে হাসতে
পারেন, তা কারও জানাই ছিল না! এটা বিনী প্রথম দেখল। সেক্রেটারি
স্যার তো বিষম-টিষম লেগে, দু-গ্লাস জল
খেয়ে ফেলার পরেও খুক খুক করে হেসেই চলল! আর মেন্টর স্যার? একবার হাসতে শুরু করলে মানুষ যে থামতে পারে না, সেটাও কি
বিনী জানত নাকি? হাসতে হাসতে রনি স্যার প্রথমে কেঁদে ফেললেন, তারপর পেট চেপে হাসতে থাকলেন, তারপর
চেয়ার থেকে হাসতে হাসতে মাটিতে নেমে এসে, হাত-পা ছড়িয়ে বসে হাসতে থাকলেন! মা-ও তখন অদ্ভুতভাবে, খিক খিক করে
হেসেই চলেছে - কারও থামার লক্ষণই নেই! এমন সময়
বেয়ারা ডেভিডদাদা এসে দরজাটা একটু ফাঁক করে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল সবে, এদের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে সে চোখ ছানাবড়া অবস্থায়, নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে রেখে ফিরে গেল পা টিপে টিপে!
ঘরভর্তি হাসির ফোয়ারা, একে অপরের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে হ্যান্ডশেক করা, অদ্ভুত
চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার হাসতে শুরু করে দেওয়া দেখে আর সহ্য হয় না ছোট্ট রুদ্রাণীর - সে ভ্যাঁ করে কেঁদেই ফেলে এবার!
----------
(এই গল্পের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ
কল্পনাপ্রসূত। কোনো জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তি বা
প্রতিষ্ঠানের কোনোরূপ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যদি এই গল্পের কোনো ঘটনার
মিল থেকে থাকে, তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত।)
----------
ছবি - নচিকেতা মাহাত
No comments:
Post a Comment