
হারিয়ে যায় না কিচ্ছুটি
পূবালী চট্টোপাধ্যায়
সকাল থেকে চাটুজ্যে বাড়িতে হুলুস্থুল। আজ কোজাগরি
লক্ষ্মী পূর্ণিমা। চাটুজ্যে গিন্নি বেবি ঠাকরুন, অর্থাৎ আমাদের ঠাকুমা, মা কাকিমা
আর পিসিদের সঙ্গে নিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে লক্ষ্মী পুজোর জোগাড়যন্ত্র সারছেন।
বাড়িতে প্রায় জনাশয়েক লোক। বিশাল পেল্লায় হাঁড়ি কড়াইয়ে সব রান্নাবান্না হচ্ছে।
বাবা কাকারা সকাল থেকেই ফাইফরমাস খাটতে খাটতে ক্লান্ত। ঠাকুরদাও সকাল থেকে একে ওকে
তলব করে বিভিন্ন কাজ করাচ্ছেন। এমনি উনি ছোটোখাটো চেহারার রাশভারী মানুষ, ওনার নামে বাঘে
গরুতে এক ঘাটে জল খায়। কিন্তু হলে কী হবে, তিনি গিন্নিমার সামনে এক্কেবারে অন্য
লোক। গিন্নি মা যা বলেন উনি তাই করেন। পেশায় উনি মোক্তার। মোক্তার মশাই, অর্থাৎ
দাদু, ঠাম্মার চোখের জল সহ্য করতে পারেন না একদম। ঠাম্মার চোখ ভিজল তো দাদুর অমন
মেজাজও গলে জল হয়ে গেল। বেবি ঠাকরুনের নাতি নাতনি মানে
আমরা এই নিয়ে ঠাকুমার সঙ্গে অনেক হাসি ঠাট্টা করি। পুজোর বাড়ি আমরা সব হই হই করে
খেলছি। হঠাৎ ঠাম্মা মাধাই-এর নাম ধরে ডাকলেন। আমি মাধাই জগাই মুনাই কানাই মিঠাই একসঙ্গে
মুড়ি আর ঘুগনি খাচ্ছিলাম। ঠাকুমার গলা পেয়ে মাধাই দৌড়ে গেল ঠাম্মার কাছে।
মাধাইকে দেখেই ঠাম্মা বললেন, “তোর দাদুকে বল ১০৮ পদ্ম ফুলের থেকে তিনটে পদ্ম
পাওয়া যাচ্ছে না। নির্ঘাত উনি আনতে ভুলেছেন। তাড়াতাড়ি এনে দিতে বল, পুজোর সময়
হয়ে এল।”
মাধাই দাদুর কাছে গিয়ে এই কথা বলতেই দাদু বললেন, “আমি
তো এনেছি। তোর ঠাম্মা নিশ্চয় কোথাও ঠিক ভুল করেছে।”
ঠাম্মা ওদিক থেকে গলা চড়ালেন, “মোটেই না, তুমি আনোনি।”
দাদু বললেন, “সব সময় জ্বালাতন। পুজো পুজো করে
বাড়িতে টেকাই দায় হল।”
এবার ঠাম্মা শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। “আমি আমার
মঙ্গলের জন্য করি তো এসব, তোমাদের তো কিছুই নয়!” বলতে বলতে পদ্মকলির মতো চোখ দুটি
জলে টলমল করে উঠল। অভিমানী গলায় বললেন, “থাক, আমি নিয়ে আসছি বাজারে গিয়ে।” আমরা জানি
এই সব কিচ্ছুটি হবে না। ঠাম্মা ঠাকুরপুজো ছেড়ে এক পাও কোথাও নড়বেন না।
দাদু এবার নড়েচড়ে বসলেন, “চলো চলো দেখি তো।”
ওদিকে বুচিপিসি ঠাম্মার সামনে কোথা থেকে তিনটে পদ্মফুল নিয়ে এসে হাজির করল। বলল, “ওখানেই
তো ছিল, তুমি দেখতে পাওনি মাসিমা।” ঠাম্মার ভ্রূ ঈষৎ বেঁকল। তবে তাড়াহুড়োয় এই
বিষয়ে আর মাথা ঘামালেন না। “দে আমাকে,” বলে বুচিপিসির হাত থেকে ফুল নিয়ে ঠাকুর
ঘরে গেলেন।
আমরা ভাই-বোনরা মজা করে খেলছি, হঠাৎ দেখি মুনাই
ওখান থেকে হাওয়া। যাকে বলে একেবারে ভ্যানিশ। চারদিকে খোঁজ খোঁজ,
কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না ওকে। ছাদ থেকে বাইরের উঠোন কোথাও নেই। আমরা যে যার মতো
করে হন্যে হয়ে খুঁজছি। মুনাই দিদির নাম ধরে ডাকছি, কিন্তু পাচ্ছি না। এ খবর যদি
বাড়ির বড়োদের কানে যায় তো আমাদের আর রক্ষা থাকবে না। আমরা সবাই মাথায় হাত
দিয়ে ভাবছি, এমন সময় চরকি এসে বলে গেল, মুনাই দিদি বাড়ির পেছনের দিকে যে লেবু
গাছ আছে তার থেকে লেবু পাড়ছে। আমরা এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। ওই গাছে তো লেবু
হয় না। তবে? আর এই পুজোর বাড়িতে লেবুই বা কেন আনতে গেছে। ওমা, ওই তো মুনাই আসছে। হাতে
বেশ কিছু পাতি লেবু। ওকে দেখেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম, “কী রে, হঠাৎ কোথায় চলে
গেলি? লেবু পেলি কোথা থেকে? ওই গাছে তো লেবু হয় না।” ও কেমন
বাঁকা হেসে বলল, “পেলাম।” আমরা হাজার জোরাজুরি করলাম আসল কারণ জানার জন্য, কিন্তু
ও মুখ খুলল না।
সকাল থেকে আজ বাড়িতে কী যে সব আজব কাণ্ড ঘটে চলেছে
এক্কেবারে মাথায় ঢুকছে না। খাবার সময় চাটনির বাটি কেউ কোথাও খুঁজে পেল না।
তাজ্জব তো! পরে সেটা পাওয়া গেল বৈঠকখানায়। সবাই বলল এ নিশ্চয় পুষির কাণ্ড। কিন্তু পুষি মাছ ছেড়ে
কবে থেকে চাটনি খাওয়া শুরু করল সেও এক বড়ো জিজ্ঞাসা। আর চাটনির বাটি ওখানে কীভাবে
গেল সেও বোঝা গেল না। আমাদের মনে কেবল একটা খোঁচা লেগে থাকল। তবে পুজোর মধ্যে এই
নিয়েও খুব একটা আলোচনা হল না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। আকাশে জ্বলজ্বল করছে
কোজাগরি পূর্ণিমার চাঁদ। বাতাসে অদ্ভুত সুন্দর মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ঠাম্মা লাল
গরদ পরেছেন। বাড়ি ভর্তি আলপনা। খুব সুন্দর এক মনোরম পরিবেশ। বাড়ির বড়োবাবু থেকে
শুরু করে ঠাকুর চাকর সবাই নতুন জামা পরেছে। আমরা ছোটোরা নতুন জামা পরে অপেক্ষা
করছি ঠাকুর আসার।
বাবা আর মেজোকাকা দুজনে মিলে ঠাকুর আনতে গেছেন।
দাদু পরেছেন গরদের ধুতি আর ঠাম্মা পরেছেন গরদের শাড়ি। পাশাপাশি দুজনকে লাগছে
লক্ষ্মী নারায়ণ। ঠাকুর আসার আগের সময়টুকু কাটতে চায় না। এই রাত্রে ঠাম্মা মা
কাকিমা জেগে থাকেন ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে। ঠাম্মা বলেন, এই দিন লক্ষ্মী ঠাকুর দেখতে
আসেন কারা জেগে আছে? কোজাগরি মানেই নাকি কে জেগে আছ বলে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে
দেখেন লক্ষ্মী ঠাকুর। এই সব টুকিটাকি কথার মাঝেই মা লক্ষ্মী এসে গেলেন বাড়ির
চৌকাঠে। লাল রংয়ের বেনারসি পরানো হয়েছে মাকে, সঙ্গে তার বাহন লক্ষ্মীপেঁচা। মায়ের
মুখটা ভারী সুন্দর হয়েছে। হুলুধ্বনি আর শঙ্খ রবে মাকে বরণ করে ঘরে তুললেন ঠাম্মা
মা আর বাড়ির মেয়েরা।
সমস্ত উপচার নিয়ম মেনে পুজো শুরু হল। হঠাৎ পুরোহিত ঠাকুর বললেন,
পুজোর যজ্ঞের কাঠ আর কলা পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে কী সে অবস্থা! মা ঠাম্মা কেঁদে
ভাসাচ্ছেন। পিসি আর কাকিমা হন্যে হয়ে খুঁজছে। এবার কিন্তু আমাদের ভয় করতে শুরু
করেছে। কেন এইসব হচ্ছে সেই কারণ খুঁজতে চারদিকে গুজগুজ ফুসফুস হচ্ছে। তবে কি
বাড়িতে অপদেবতা এল?
মা লক্ষ্মীর অবস্থান যেখানে এমন অঘটন কীভাবে ঘটতে পারে!
ওদিকে এসব কাণ্ড দেখে জগু পিসো ধ্যানে বসবেন বলে
মনস্থির করলেন। তিনি নাকি যোগ বিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। ঠাম্মা আকুল নয়নে
বললেন, “বাবা জগু, দেখো তো কী ঘটল। কেন এসব হচ্ছে?” রিন্তি পিসি এই সব একদম বিশ্বাস
করে না। জামাইবাবুর এই সব কাণ্ড দেখে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “যত সব বুজরুকি! আমি
এখুনি পুলিশে ফোন করছি।” হাতের মোবাইল থেকে যেই না ফোন করতে যাবে অমনি ঠাম্মা
কান্না জুড়লেন, “ওরে রিন্তি, আমার মাথা খা পুজোর দিনে বাড়িতে পুলিশ ডাকিস না মা।
বাবা জগু, তুমি যোগ সাধনায় দেখো তো শিগগিরি।” ধ্যানে বসে পিসো সবাইকে ওখান থেকে
চলে যেতে বললেন।
আমরা সবাই ভয়ে মনমরা হয়ে আছি। কিছুই ভালো লাগছে
না। দাদু আমাদের সবাইকে ডেকে ওনার কাছে বসালেন। আমরা ছাদের চিলেকোঠা ঘরে দাদুর সঙ্গে
বসলাম। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশটাকে কী অপূর্ব মায়াবী করে তুলেছে কী
বলব! আমাদের ছাদের ওপর এসে পড়েছে বাড়ির নিম গাছের কিছু ডাল। মা বলেন নিম গাছের হাওয়া
গায়ে লাগা খুব ভালো। নিম গাছের কচি পাতা ভেজে গরম ভাতে ঘি দিয়ে খেতে আমার খুব
ভালো লাগে। মিঠাই আবার এই পাতা দাঁতেও কাটে না। ওর খুব তেতো তেতো বাতিক। বাকি ভাই
বোনরা বড়োদের বকার ভয়ে তবুও জোর করে খেয়ে নেয়। নিম গাছ ছেড়ে আমার চোখ হঠাৎ অল্প
আলো আঁধারিতে মাখা নারকোল গাছটার দিকে পড়ল। আচমকা মনে হল ওই গাছে মগডালে কে যেন
বসে। আমি ভয়ে জগাইয়ের দিকে সরে গেলাম। দাদু বোধহয় আমার চোখের ভয় খেয়াল করে
থাকবেন। উনি বললেন, “তোরা এত চিন্তা করিস না। কী রে টুকাই, ভূতের ভয় পেলি? ভূত বলে কিচ্ছুটি
নেই। শোন, তোদের একটা গল্প শোনাই। বাড়ির কোনো কিছুই হারিয়ে যায়নি। কোনো কিছুই
হারিয়ে যায় না আসলে। আমরা শুধু ঠিকভাবে খুঁজতে পারি না। ঠিকঠাক খুঁজতে যদি কেউ
পারে তবে ঠিক পেয়ে যাবে।”
দাদু গল্প বলতে শুরু করলেন...
একবার মা লক্ষ্মী স্বর্গরাজ্য থেকে হারিয়ে গেলেন। ঋষি
দুর্বাসা একবার ইন্দ্রকে পারিজাত পুষ্পের মালা দিয়েছিলেন। সুরায় মত্ত হয়ে সেই
মালা ইন্দ্র তার হাতি ঐরাবতের শুঁড়ে পরিয়ে দিলেন। অমনি হাতি সেই গন্ধ সহ্য
করতে না পেরে মালা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। দুর্বাসা ভীষণ রেগে ইন্দ্রকে অভিশাপ দিলেন,
স্বর্গরাজ্য শ্রীহীন হবে। সঙ্গে সঙ্গেই মা লক্ষ্মী স্বর্গরাজ্য ছেড়ে প্রবেশ করলেন
সমুদ্রের গভীরে। দেবতাদের তো মাথায় হাত। তারপরে ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শে সবাই মিলে
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল সমুদ্র মন্থন করার। বিষ্ণু নিলেন কুর্ম অবতার। বিষ্ণুর
পিঠের উপরে মন্দার পর্বতকে স্থাপন করা হল। বাসুকি নাগ হল দড়ি। তারপরে
একদিকে রাক্ষসরা অন্যদিকে দেবতারা বাসুকি নাগের মাথা ও লেজ ধরে সমুদ্র মন্থন করতে
লাগল। সমুদ্র মন্থনের সময় একে একে নানান জিনিস সমুদ্র থেকে উঠে
আসতে লাগল। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন লক্ষ্মী কখন উঠে
আসবে। এরপর বিদ্যুতের মতো আলোর ছটা নিয়ে মা লক্ষ্মী উঠে এলেন সমুদ্র থেকে।
ব্রহ্মা লক্ষ্মীকে বললেন বিষ্ণুর কাছে যেতে। লক্ষ্মীর হাতে দিলেন ব্রহ্মা তার
নিজের পদ্মফুল।
দাদু বললেন, “তোরা বল তো লক্ষ্মীকে অন্য কী নামে
ডাকা হয়?”
আমরা এ ওর মুখ চেয়ে বললাম, “কমলা।”
দাদু বললেন, “আর?”
আমরা দু-দিকে মাথা নাড়লাম।
দাদু বললেন, “লক্ষ্মীর নাম আগে লক্ষ্মী ছিল না, আগে
লক্ষ্মীকে শ্রী বলে ডাকা হত।”
এরপর দাদু বললেন, “কোথায় যেন ছিলাম?”
আমি বললাম, “ঐ যে ব্রহ্মা লক্ষ্মীকে বলল…।”
দাদু মনে করে আবার বলতে শুরু করলেন...
শ্রী বা লক্ষ্মী তখন ব্রহ্মার কথা শুনে বিষ্ণুর
কাছে গেলেন এবং তিনি বিষ্ণুর ঘরনি হলেন। এই ভাবে হারানো শ্রী খুঁজে পাওয়া গেল
স্বর্গরাজ্যে। স্বর্গরাজ্যে আবার সমস্ত সমৃদ্ধি ফিরে এল।
আমরা সবাই হাঁ করে দাদুর কাছে গল্প শুনছি। খুব
বেশিক্ষণ নয়, এর মধ্যেই পুজোর যজ্ঞের ধোঁয়া আমাদের চোখে মুখে এসে লাগল। আমরাও গল্পের থেকে বাস্তব
জগতে ফিরে এলাম। দাদুর গল্প শুনতে শুনতে কোথায় যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হারিয়ে
গিয়েছিলাম। এর মধ্যে মা বেশ কয়েকবার আমাদের ডেকেছেন। সেই ডাক কানে গেছে, কিন্তু
আমরা সেই ডাক অগ্রাহ্য করে গেছি পুরাকালের কাহিনি শোনার নেশায়। দাদুর গল্প বলা শেষ
হতে পেছনে ফিরে দেখি ফুলকাকা দাঁড়িয়ে আছে।
“ওমা, তুমি কখন এলে?” কানাই বলল।
কাকা কেমন একটা হাসি হেসে বললেন, “বল তো দেখি কখন
এসেছি?”
আমি বললাম, “জানো তো ফুলকাকা, আজ সকাল থেকে বাড়িতে
কীসব অদ্ভুত জিনিস হয়ে চলেছে।”
কাকা, দাদুকে প্রণাম করতে গেলেন। দাদু বললেন, “থাক, আজ
ঠাকুর পাটে আছেন, আজ প্রণাম কোরো না। লক্ষ্মী পুজোতে ছুটি পেলে তাহলে!”
ফুলকাকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। তারপর আমাদের বললেন, “অনেক
গল্প শুনেছ দাদুর কাছে, এবার সবাই চলো নীচে।”
নীচে এসে আমরা পুজোর দালানের কাছে গিয়ে অবাক হয়ে
দেখলাম জগু পিসো ঠাম্মাকে বলছে, “দেখলেন তো মা, আমি ঠিক কীভাবে খুঁজে পেলাম
যজ্ঞের কাঠ।”
ফুলকাকা পাশ থেকে বলল, “আপনি কোথায় বের করলেন? সে
তো আমি এসে খুঁজে দিলাম।”
জগু পিসো আমতা আমতা করে বলল, “আমি ধ্যানে বসে দেখতে
পেয়েছিলাম চরকি কাঠগুলোকে ছাদে রোদে দিয়ে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে রেখে এসেছিল।”
আমরা ছোটোরা এর ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমরা
তো চিলেকোঠার ঘরেই ছিলাম, কেউ তো দেখতে পাইনি। মিঠাই বলল, “তাজ্জব ব্যাপার তো।”
জগাই বলল, “সকাল থেকে হচ্ছে এই সব ভৌতিক কাণ্ডকারখানা। লক্ষ্মী পুজোর দিন এ কী
অনাসৃষ্টি!”
ফুলকাকা বলল, “শোন, পুজো হয়ে এসেছে, প্রসাদ খেয়ে
নে তোরা, তারপর আমি সব ঘটনা প্রথম থেকে খোলসা করে বলছি।”
ফুলকাকা বসলেন রহস্যের জট ছাড়াতে রিন্তি পিসিকে সঙ্গে
নিয়ে। পুজো শেষ, প্রসাদ খাওয়া শেষ। বাড়িতে অতিথি যারা এসেছেন তারাও পুজোর
ভোগপ্রসাদ খেয়ে যে যার বাড়ি চলে গেছেন। আমরা সবাই ঠাকুর দালানে বসে। বাবা বললেন,
“ফুল, বল এবার কী হচ্ছে সকাল থেকে।”
“প্রথমেই আসি পদ্ম ফুলের কথায়। মা লক্ষ্মীর আলয় হল পদ্ম
ফুল। তাই মা লক্ষ্মী হলেন পদ্মা। তো এই পদ্মফুল আমাদের বাড়ির ছোটো লক্ষ্মী, থুড়ি
মানে ছোটো বৌদি সরিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরের তাকে। পরে ওখান থেকে আনতে গিয়ে তিনটে
ফুল থেকে গিয়েছিল। আর উনি তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। পরে বুচি খুঁজে পায়।”
ছোটোকাকি দেখলাম জিভ কাটছেন।
“বল তো মুনাই, তুই পাশের মিনু পিসির বাড়ি কেন
গিয়েছিলি?”
মুনাই দেখলাম ভয়ে মুখ নীচু করছে।
রিন্তি পিসি বলল, “আচার খেতে, তাই তো?”
মুনাই ঘাড় নাড়ল।
“আর পিসি তোমায় লেবু দিয়েছিল। কী রে, তাই তো?”
মুনাই এবারও ঘাড় নাড়ল।
“তাহলে বললি না কেন আমাদের?” জগাই জিজ্ঞেস
করল।
ফুলকাকা বলল, “তোদের ঘাবড়ে দেবার জন্য ওর মাথায়
দুষ্টু বুদ্ধি খেলছিল।”
মুনাই বলল, “সরি, আর হবে না।”
“এবার আসি চাটনির কথায়। কী রে মাধাই, আমি বলব না
তুই বলবি?” ফুলকাকা জানতে চাইল।
মাধাই ঠাম্মার দিকে করুণ চোখে চেয়ে। আমাদের আর
কিছু বুঝতে বাকি রইল না। দাদু ঠাম্মার দিকে অগ্নি চোখে তাকাল। ঠাম্মার গলা ভিজে
গেছে কান্নায়। “আমার সুগারের জন্য তোমরা তো আমায় মিষ্টি খেতেই দাও না। তাই
মাধাইকে বলে চাটনির বাটিটা সরিয়ে রেখেছিলাম। তোমাদের দিয়েই খেতাম।”
দাদু ঠাম্মার ওপরে এবার বেদম খেপে গেলেন। কথা বলছেন
না রাগ করে। ঠাম্মাও দমে যাওয়ার মানুষ নন। চোখে জল এনে ঠাম্মার শেষ ব্রহ্মাস্ত্র
প্রয়োগ করলেন। দাদুর কাছে গিয়ে বাচ্চাদের মতো বললেন, “আমায় একটুখানি খেতে দিও
চাটনি।” ঠাম্মার কথা বলার ধরনে দাদু হেসে ফেললেন। আমাদের সবার মুখের হারিয়ে
যাওয়া হাসিও ফিরে এল। ফুলকাকা আর রিন্তি পিসি আরও একবার সুদক্ষ গোয়েন্দা হিসেবে
স্বীকৃতি পেল। দাদু হাসতে হাসতে বললেন, “দেখলে তো তোমরা, কোনো কিছুই হারিয়ে যায়
না। ঠিকভাবে খুঁজলে সব পাওয়া যায়।”
----------
ছবি - মেটা এআই
No comments:
Post a Comment