গল্প::শোনো, তাঁর নূপুর বাজে - সুমন মিশ্র


শোনো, তাঁর নূপুর বাজে
সুমন মিশ্র

এক

মহালয়ার আর পাঁচদিন বাকি মায়ের মর্ত্যে আগমনের আর বেশি দেরি নেই চারপাশে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা, আগমনির সুর শরতের সুনীল আকাশ জুড়ে সাদা মেঘেদের নিরলস ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা রোদটাও যেন গত কয়েকদিনে কেমন পালটে গেছে সেই মিঠেকড়া রোদে যেন এক মায়াময় পুজোর আবেশ চারপাশটা আলোয় ঝলমল করছে যদিও বেলা বাড়তেই ক্রমশ রোদের কড়া ভাবটা প্রকট হয়ে ওঠে সকল কাজের মাঝেও মনটা যেন হঠাৎ করে বাউল হয়ে যায় ছুটে যেতে চায় কাটি ভৈরবের দুকূলের বিস্তীর্ণ শ্বেতশুভ্র কাশবনে
কাটি ভৈরব একসময় ছিল সরস্বতীর একটা ছোটো শাখা নদী এককালে নাকি এখানেও জোয়ার ভাটা খেলা করত চলত ছোটো বড়ো নৌকা এখন সেইসব কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি মাত্র শতবর্ষ পূর্বেও ক্ষীণ জলধারা জীর্ণ স্মৃতি বুকে নিয়ে বয়ে চলত, কিন্তু আজ সেখানে শুকনো নদীখাতে পাক খায় তার সোনালি অতীতের গল্পগাছা
নদীর পাড়ের ঘন কাশবনের অপরূপ শোভার মাঝে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ ভগ্নদশা প্রাপ্ত চাঁদনির অংশ এখানকার জমিদার শশিকান্ত মুখোপাধ্যায় এই চাঁদনি দেওয়া বাঁধানো ঘাট তৈরি করেছিলেন ঘাটের পাশেই অবস্থিত অতি প্রাচীন পাতাল ভৈরবের মন্দির
পাতাল ভৈরবের মন্দির কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা কেউ বলতে পারে না কথিত বহুকাল আগে, পাল আমলে একবার প্রবল খরার ফলে কাটি ভৈরবের জল শুকিয়ে গেলে নদীখাতে এই শিবলিঙ্গ দৃশ্যমান হয়েছিল, তাই নাম পাতাল ভৈরব হয়তো সেই থেকেই এই গ্রামের নামও একসময় হয়ে যায় ভৈরবপুর
নিস্তব্ধ অলস দুপুরগুলোয় আজও কান পাতলে শোনা যায়, ভাঙা শান বাঁধানো ঘাটে অতীত ফিসফিস করে বলে চলেছে, ভৈরবপুরের জমিদারদের জাঁকজমকের কথা
এখানকার জমিদার বাড়ির বয়েস প্রায় দুইশো ছুঁই ছুঁই এখানকার প্রথম জমিদার উমাকান্ত মুখোপাধ্যায় ছিলেন বেদ, উপনিষদের পণ্ডিত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা বেশ কিছুকাল বর্ধমান রাজা, মহারাজাধিরাজ বাহাদুর তেজ চাঁদ রাইয়ের চিকিৎসা করে, রাজ অনুগ্রহে সপ্তগ্রামের নিকট ভৈরবপুরে প্রভূত ভূসম্পত্তির অধিকারী হন যদিও ততদিনে তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন, শুভ্র বেশ, শুভ্র কেশ মানুষটির মন ততদিনে ঈশ্বর চেতনায় নিমজ্জিত হয়েছে ফলে কিছুকালের মধ্যেই সেই সম্পত্তির দায়িত্ব তিনি তাঁর পুত্র শশিকান্তের হাতে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হলেন
শশিকান্ত বিভিন্ন ব্যাবসায় বিনিয়োগ করে উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সম্পত্তিকে বহুগুণে বর্ধিত করেন ভাগ্যলক্ষ্মীর আশীর্বাদে কিছুকালের মধ্যেই তিনমহলা বাড়ি, বৈঠকখানা, ঠাকুরদালান, কাছারি বাড়ি, অথিতিশালা, হাতিশালা তৈরি হল
ক্রমশ জমিদারির জৌলুস বাড়তে থাকল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করল দুর্গা পুজোর সময় উমাকান্ত শেষ বয়েসে স্বপ্নাদেশ পেয়ে দুর্গা পূজা শুরু করেছিলেন সময়ের সঙ্গে ক্রমশ সেই পুজোর জাঁকজমক আরও বাড়ল
একসময় দুর্গা পুজোর কলাবউ স্নান করানোর সময় এখানে একশো ঢাক বাজত বোধনের সময় যে তোপ দাগা হত তার শব্দ শোনা যেত এক ক্রোশ দূরে সরস্বতীর মূল স্রোতধারায় ভেসে চলা বজরার থেকে প্রতিপদ থেকে চলত লেঠেলদের লাঠির কসরত, পালাগান, কবিগানের লড়াই গ্রামের সকলের ওই কয়েকদিন জমিদার বাড়িতে থাকত অবাধ প্রবেশাধিকার, যদিও একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে বসেই তারা পালাগান দেখতে পেত বড়ো বড়ো ব্রিটিশ কর্তাদের যাতায়াত থাকত পুজোর ক’টা দিন একবার নাকি লর্ড কার্জনও এসেছিলেন এই বাড়িতে
বিসর্জনের সময় দুটি নৌকা করে মাতৃপ্রতিমাকে কাটি ভৈরবের স্রোত বেয়ে নিয়ে যাওয়া হত সরস্বতীর মূলধারায় সেখান থেকে নৌকা পথে নিয়ে গিয়ে ত্রিবেণীতে বিসর্জন দেওয়া হত যদিও তার বহু আগেই সরস্বতী পুরোনো গৌরব হারিয়েছে, তবুও তার প্রাণশক্তি যথেষ্টই অবশিষ্ট ছিল নদী তখনও চওড়া ছিল, স্রোতও ছিল যথেষ্ট
আজ কাটি ভৈরব বিলুপ্ত, সরস্বতী স্রোতহীন, শীর্ণকায়া ভৈরবপুরের অতীত জৌলুসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়িটি দশ বিঘা জমির উপরে তৈরি জমিদার বাড়ির বিভিন্ন মহলের সিংহভাগই জঙ্গলাকীর্ণ কোথাও জঙ্গল এতই ঘন যে সেখানে গত দশ বছরে কোনো মানুষের পা পড়েনি হাতিশালা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না অতিথিশালা ভেঙে পড়েছে কবেই, এখন তা শুধুই ইটের ধ্বংসস্তূপ জঙ্গল আগাছায় ঢেকে গিয়ে তাঁকে খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর শুধু জঙ্গলের মাঝে কয়েকটা স্তম্ভ ইটের পাঁজরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে অতীতের কথা স্মরণ করাচ্ছে বড়ো তরফের দালান বাড়ির ছাদ কবেই ভেঙে পড়েছে বিবর্ণ খড়খড়ির দরজা জানলা কিছু ভেঙে পড়েছে, কিছু চুরি হয়ে গেছে পলেস্তারা খসে ইটের পাঁজর বেরিয়ে, সর্বাঙ্গে বট, অশ্বত্থের শিকড়ের আভরণে সজ্জিত হয়ে হানাবাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে বড়ো তরফের বংশধরেরা সবাই প্রবাসী পূর্বপুরুষের ভিটের প্রতি তাঁদের কোনো টান নেই
বৈঠকখানা, কাছারি বাড়ি আর ঠাকুর দালান এখনও টিকে আছে যদিও গত আষাঢ়ে প্রবল বৃষ্টিতে কাছারি বাড়ির একাংশের ছাদ ভেঙে পড়েছে এর মধ্যে ঠাকুরদালানের অবস্থাই সবথেকে ভালো কারণ সব গেলেও দুর্গা পুজো এখনও টিকে আছে ছোটো তরফের বংশধরেরা কলকাতায় থাকলেও পুজোর সময়ে এখানে ফিরে আসেন তাঁরাই প্রতিবছর সামর্থ্য অনুযায়ী ঠাকুর দালানের মেরামতি করান


দুই

ভৈরবপুরের জমিদার বাড়িতে এখন সাজো সাজো রব ছোটো তরফের কর্তাদের গ্রামে ফেরার সময় হয়ে এসেছে বলে ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ চলছে পুরোদমে
ঠাকুর দালানে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে জোরকদমে মায়ের মূর্তির কাঠামোয় মাটির প্রলেপ পড়ে গেছে দেড় শতাব্দী প্রাচীন ঝাড় লন্ঠনটি সামনের উঠোনে রেখে পরিষ্কার করছে মতি পাঁচ খিলানের দুর্গা দালানে নতুন রং করার কাজ চলছে
ঠাকুর দালানের কড়িবরগায় পায়রার ঝাঁক একটানা বকম বকম করে সকলকে কাজে উৎসাহ দিয়ে চলেছে সূর্য এখন মাথার উপরে নীলমণি ঠাকুর দালানের সামনে উঠোনের এক কোনায় ছায়ায় বসে গুজু আর বাতাসিকে খাইয়ে দিচ্ছিল নীলমণির আর কতটুকু সামর্থ্য সেদ্ধ ভাত, ডাল, ঝাল আলুসেদ্ধ এটুকুই সে দুপুরের খাওয়ার জন্যে ব্যবস্থা করতে পেরেছে সঙ্গে আছে আদিসপ্তগ্রাম বাজারের রফিকুলের দোকান থেকে কেনা টক-ঝাল আমের আচার সেটাই দুই ভাই বোন তৃপ্তি করে খাচ্ছে
নাতি নাতনিকে দুপুরে খাওয়ানোর দায়িত্ব তার নয়, বাড়িতে বউমাই এটা করে থাকে কিন্তু আজ রবিবার, খুদে দুটোর স্কুল ছুটি সকাল থেকে গ্রামের অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে কাশবনে হুটোপাটি করে, একগাদা কাশের গোছা কাঁধে নিয়ে তারা ঠাকুর তৈরি দেখতে এসেছে শুধু তাই নয়, বায়নাও ধরেছে ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনতে শুনতে খাবে
নীলমণির প্রায় চার কুড়ি বয়েস হতে চলল চোখে মোটা চশমা শ্যামবর্ণ শরীরটা চলতে গেলে সামনে ঝুঁকে পড়ে কাজ করতে গেলে হাত কাঁপে মাথা ভর্তি সাদা শনের মতো চুল হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যায় গালে খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি তারা সাত পুরুষ ধরে এই জমিদার বাড়ির প্রতিমা বানাচ্ছে এছাড়া পুজোর দিনগুলোয় এ বাড়িতেই থেকে বিভিন্ন কাজকর্মে সাহায্যও করে
একসময় নীলমণি একাই একশো ছিল, কিন্তু এখন আর পেরে ওঠে না প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব সে তার ছেলের কাঁধে তুলে দিয়েছে, সে শুধুই তদারকি করে

বাতাসি অভিমান মেশানো গলায় বলল, আমি আর খাব না
নীলমণি ভাত আলুসেদ্ধর ছোটো ছোটো গোল্লা পাকিয়ে দুই ভাই বোনকে খাওয়াচ্ছিল তেমনই একটা ছোটো গোল্লা বাতাসির মুখের কাছে ধরে, ফোকলা হাসি হেসে বলল, তা বললে কি চলে দিদিভাই, এই গরসটা নাও একটু না খেলে বিকেলে খেলবে কী করে?”
গুজু বলল, না খাবো না তুমি ভালো গল্প শোনাচ্ছ না
নীলমণি অবাক কণ্ঠে বলল, ওমা জমিদারির গল্প বলছি সেটা ভালো লাগছে না?”
বাতাসি বলল, তুমি রোজ একই গল্প বল, নতুন কিছুই বল না ওই দাদাটাকে তো তুমি কত গল্প বলছিলে এই বাড়ির দুর্গা পুজোর ব্যাপারে, আমরাও সেই গল্প শুনববাতাসি আঙুল তুলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কলেজ পড়ুয়া ছেলেটাকে দেখাল ছেলেটা শ্রীরামপুরের কোন এক কলেজে পড়ে তার হাতে মোবাইল ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছে সকালে এসেই নীলমণিকে পাকড়াও করে এই বাড়ির দুর্গা পুজোর ব্যাপারে সে অনেক খবর নিয়েছে তার নাকি কী একটাউটুবচ্যানেল আছে সেই চ্যানেলের জন্যেই ছবি তুলছে
নীলমণি ওসব বোঝে না, তবে ছেলেটাকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে সাদাসিধে, ভদ্র তবে গুজু আর বাতাসির সঙ্গেও যে ছেলেটির ভালোই খাতির হয়েছে সেটা সে বুঝতে পারল যখন বাতাসি জোর গলায় ছেলেটিকে ডাকল, শুভদা, এদিকে এসো না দেখ দাদু গল্প বলছে না
নীলমণি হেসে ফেলল ছেলেটিও বাতসির গলা শুনে নীলমণিদের পাশে এসে বসল
নীলমণি কৌতুক মেশানো গলায় বলল, সকলে একজোট হয়েছে? তাহলে তো গল্প শোনাতেই হয়
ছেলেটি মোবাইল বের করতে যাচ্ছিল, নীলমণি ইশারায় বারণ করল, সবকিছু কি ওই যন্তরটায় বন্ধ করা উচিত বাবা? কিছু জিনিস আছে ভক্তি ভরে শুনতে হয় হৃদয়ের খাঁচাটায় বন্ধ করে রাখতে হয়
নীলমণি গুজুর মুখে একটা গরস দিয়ে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল তারপর দূরমনস্ক গলায় বলতে শুরু করল -
জানি না গুজু আর বাতাসি এই গল্পটা তাদের মায়ের কাছে আগে শুনেছে কিনা শুনলেও আমি যতটা বিশদে বলব, ততটা হয়তো শোনেনি কারণ গ্রামের প্রায় সকলেই লোকমুখে চলে আসা এই গল্প অল্পবিস্তর জানলেও, পুরো গল্পটা জানে না এর একটা কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে চলতে গল্পটার বেশিরভাগ অংশ ক্ষয়ে গিয়ে শুধু সারটুকুই পড়ে আছে জমিদার পরিবারের সদস্য ছাড়া আমার মতো কয়েকজন, যারা পুরুষানুক্রমে এই বাড়ির রীতিনীতির সঙ্গে জড়িত, যাদের পুজোর সময় এই বাড়িতে রাত্রিবাসের সৌভাগ্য হয়েছে তারাই জানে এই অনুভব কতটা সত্য আমি আমার ছেলেকেও পুরো গল্পটা বলেছিলাম যখন সে প্রথমবার আমায় সাহায্য করার জন্য পুজোর সময় এই বাড়িতে রাত কাটিয়েছিল এবং এই অলৌকিক অনুভব লাভ করেছিল
“সাধারণত বাইরের লোকেদের সামনে আমরা এই ব্যাপারে কথা বলি না এটাই এখানকার রীতি কারণ যে গভীর ভক্তি বিশ্বাস এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তা উপলব্ধি সবাই করতে পারে না
“তুমি শহুরে ছেলে, হয়তো ভাববে এই বুড়োটার ভীমরতি হয়েছে, উলটোপালটা বলছে কিন্তু ঈশ্বর জানেন আমি বানিয়ে বলছি না এমন কত কিছুই তো ঘটে থাকে যা সাধারণ বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা করা যায় না এই যে আমি কথাগুলো বলতে চলেছি সেটা ভেবেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, শিরদাঁড়া দিয়ে এক অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি বয়ে চলেছে যদি বলি যে এই ভৈরবপুরের জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালানে পঞ্চমীর রাতে মা স্বয়ং নূপুর পায়ে হেঁটে বেড়ান, দুষ্টের দমন করেন, বিশ্বাস করবে?”

হঠাৎ করে এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে বাতাসি হাঁ করে তাকিয়ে ছিল নীলমণির দিকে
গুজু অবাক হয়ে বলল, মা আমাদের এটুকুই বলেছিল প্রতিবারই পুজোর সময় বলে কিন্তু এর সঙ্গে আর কোন গল্প তো বলেনি
শুভর মুখেচোখে অবিশ্বাস স্পষ্ট, সে ইতস্তত করে বলল, মা মানে, আপনি মা দুর্গার কথা বলছেন?”
এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তির হাসি নীলমণির মুখমণ্ডলের অজস্র অভিজ্ঞতা ক্লিষ্ট বলিরেখায় যেন ছড়িয়ে পড়ল সে আনন্দঘন কণ্ঠে বলল, মা তো একমাত্র তিনিই সমস্ত জগতের মা তিনিই পালন করেন, তিনিই দমন করেন
গুজু হাততালি দিয়ে বলল, আমি দুগগা মাকে দেখব
নীলমণি হেসে গুজুর দিকে তাকিয়ে কৌতুক মেশানো গলায় বলল, তাঁকে তো দেখা যায় না দাদুভাই তাঁর নূপুর ধ্বনি শোনা যায়?”
শুভ গম্ভীর গলায় বলল, আপনি পুরো গল্পটা বলুন, আমি শুনছি

নীলমণির আবেগে কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে উঠল, উমাকান্ত মুখোপাধ্যায়ের এক স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে এই পরিবারে দুর্গা পুজোর শুরু তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন মা এখানে অভয়া রূপে বিরাজ করবেন তাঁর সঙ্গে সিংহ থাকবে না থাকবে না অসুর মায়ের পাশে থাকবেন স্বয়ং শঙ্কর মহাদেব মা তাঁর পাশে পার্বতী রূপে অধিষ্ঠান করবেন তাঁর হাতে থাকবে বরাভয় মুদ্রা তাঁর গাত্রবর্ণ হবে অতসী ফুলের ন্যায়

কিন্তু আমি আগের যত ছবি দেখেছি ইউটিউবে সেখানে তো দেখেছিলাম মায়ের গাত্র রক্তিম বর্ণ, শুভ নীলমণিকে মাঝপথেই থামাল
ঠিক বলেছ এখানেই আসল গল্পের শুরুনীলমণি উৎসাহ ভরা গলায় বলল, এভাবেই বছরের পর বছর পুজো চলছিল মায়ের জাঁকজমকের কথা তো সকালে যখন কথা হচ্ছিল তখনই বলেছিলাম কিন্তু একবার ভারি গণ্ডগোল হয়ে গেল
“সেটা ছিল ভারি অস্থির সময় যদিও নীলবিদ্রোহের শুরুর তখনও বছর দুই বাকি, কিন্তু নীলকরদের অত্যাচারে গ্রাম বাংলার সাধারণ চাষিদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়
“এখান থেকে কাটি ভৈরবের পাড় বরাবর পশ্চিমে কিছুটা গেলে এক ভগ্ন নীলকুঠির অবশেষ আজও চোখে পড়ে ওই নীলকুঠিতে সেই সময় থাকতেন ডেসমন্ড সাহেব সাহেব নিজে কথা বলতেন কম, তার চাবুকই সব কথা বলত সেবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় ঠাকুর দালানের সামনে রাবণ বধ পালা চলছিল সামনের সারিতে ডেসমণ্ড সাহেব পায়ের উপর পা তুলে জমিদারবাবুর পাশের কেদারায় বসে গড়গড়ি টানছিলেন পরের সারিগুলোয় জমিদারবাবুর পরিবারের লোকজন, পাত্র, মিত্র মোসাহেবদের ভিড় তার পিছনে গ্রামবাসীদের ভিড় চারপাশে আলোর রোশনাই বৈভবের উদযাপন এর মধ্যেই একটা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে গেল জটায়ু বধ দেখে গ্রামের এক বাচ্চা ছেলে রাবণের হাত থেকে জটায়ুকে বাঁচানোর জন্যে গুলতি ছুড়ে বসল আর সেই গুলতি সোজা এসে পড়ল ডেসমণ্ড সাহেবের মাথায় আর যাবে কোথায়, পালাগান শিকেয় উঠল সঙ্গে সঙ্গেই বাচ্চা ছেলেটিকে ধরে বেঁধে আনা হল ডেসমণ্ড সাহেব তখন রাগে ফুঁসছেন, ছেলেটিকে সামনে দেখে চিৎকার করে উঠলেন ইউ ডিড ইট?’
“ছেলেটি অত বোঝে না, সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল জমিদারবাবু চিৎকার করে উঠলেন গুলতি কেন ছুড়েছিস বল?’
“ছেলেটি আমতা আমতা করে বলল – ‘সাহেবকে মারিনি, রাবণকে মেরেছিলাম নিশানায় লাগেনি
“ডেসমণ্ড সাহেব ছেলেটির কথা না বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করলেন যে ছেলেটি কী বলছে জমিদারবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই এক মোসাহেব বলল – ‘হি ডিড ইট স্যার... মানে ইচ্ছে করেই মেরেছে
“ডেসমণ্ড সাহেবের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল, কিছু বোঝার আগেই তিনি তার চাবুক সজোরে চালালেন চাবুকের শেষ প্রান্ত ছেলেটার কপালে সপাটে আঘাত করতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল ছেলেটি তৎক্ষণাৎ সেই যে মাটিতে পড়ল এই জন্মে তার আর চোখ খুলল না
মরেই গেল?” শুভ চোখ বড়ো বড়ো করে বলল
নীলমণি মাথা নাড়ল, ডেসমণ্ড সাহেব তখনই জমিদার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন পুজোর মধ্যে এমন অপঘাতে মৃত্যু ঘটায় পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল ঠাকুর দালান জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ছেলেটির বাবা মায়ের হাহাকার উঠোন পরিষ্কার করে শোধন করতে হল বোধন ষষ্ঠীতে হলেও প্রতিপদ থেকেই এই বাড়িতে পুজোর নানান রীতিনীতি পালন হতে থাকে পঞ্চমীর সন্ধেতেও কিছু পুজোর কাজ ছিল কিন্তু দেখা গেল বারবার পুজোর কাজে বাধা পড়তে শুরু করল গুঞ্জন শুরু হল যে মা কুপিত হয়েছেন সেইদিন রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে হঠাৎ ঠাকুর দালানে নূপুরের ধ্বনি শোনা গেল কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছেন ততক্ষণে জমিদার বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ মানুষই নিদ্রামগ্ন হয়েছে নিস্তব্ধ বাড়িতে সেই নূপুর ধ্বনি যেন প্রতিধ্বনিত হতে থাকল যাদের ঘুম ভাঙল তারা ঘরের বাইরে এসে কাউকেই দেখতে পেল না সদর দরজার দারোয়ান ঝিমোচ্ছিল, কিন্তু সেও নূপুরের শব্দে ঘুম ভেঙে ছুটে এসে কাউকে দেখতে পেল না
“পরের দিনও ষষ্ঠীর বিভিন্ন কাজে বারংবার বাধা পড়তে শুরু করল জমিদার বাবুর গুরুদেব পুজো উপলক্ষ্যে সেদিনই এসে পৌঁছেছিলেন তিনি সব শুনে দেবীর সামনে কিছুক্ষণ ধ্যান করলেন তারপর মন্ত্র পড়ে ঠাকুর দালান শোধন করলেন তারপর সকলকে বললেন – ‘মায়ের পূজা প্রাঙ্গণে নির্দোষের রক্তপাত হয়েছে, তাই মা কাল কুপিত হয়েছিলেন ক্রোধের বশে কাল রাত্রে তিনি ঠাকুরদালান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন পাপীকে শাস্তি দিতে তিনি হয়তো আর এই ঠাকুর দালানে ফিরে আসতেন না তবে চিন্তার কিছু নেই, তাঁর পিছু পিছু মহাদেব স্বয়ং গিয়েছিলেন তাঁকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনার জন্যে ভোলানাথ পাতাল ভৈরবের মন্দির থেকে দেবীকে শান্ত করে ফেরত নিয়ে এসেছেন তবে দেবীর ক্রোধ এখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি তাই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ রূপে এবার থেকে দেবীর গাত্র হবে রক্তিম বর্ণ’”
তার মানে সেই থেকেই এই প্রথা চলে আসছে?” শুভ জিজ্ঞাসা করল
নীলমণি রহস্যঘন গলায় বলল, হ্যাঁ প্রথাই বটে তবে এখনও কিছুটা বাকি আছে ষষ্ঠীর রাতে খবর এল নীলকুঠিতে সদর থেকে সাহেব ডাক্তার এসেছেন ডেসমণ্ড সাহেবের নাকি গতকাল রাত থেকেই হঠাৎ করে প্রবল জ্বর এসেছে অনেক চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হল না দশমীর দিন বিসর্জনের আগেই খবর এল সাহেব আর নেই সারা গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল খবরটা…”
আর সেই থেকেই এই লোককথার জন্ম?” নীলমণিকে মাঝপথে থামিয়ে শুভ জিজ্ঞাসা করল
লোককথা?” নীলমণি বিরক্তি মেশানো গলায় বলল, কোনটা লোককথা? তারপর থেকে যে প্রতি বছর দুর্গা পঞ্চমীর রাত্রি দ্বিপ্রহরে ঠাকুর দালানে নূপুরের ধ্বনি শোনা যায়, সেটা শুধুই লোককথা? নাকি পঞ্চমীর রাত্রে পাপীদের মা শাস্তি দেন সেটা লোককথা? বিপ্লবীদের উপর অত্যাচার করত যে মিল্টন সাহেব, তার করুণ পরিণতি ঘটেছিল এই পঞ্চমীর রাত্রে দুর্ভিক্ষের সুযোগে অত্যাচার চালানো মহাজন সত্যেন মজুমদার মহালয়ার দিন আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল বাগদী পাড়ায়, তারও করুণ পরিণতি ঘটেছিল পঞ্চমীর রাতে সব লোককথা? শোনো ছোকরা, প্রতি পঞ্চমীতে মা জাগ্রত হয়ে অপরাধীদের শাস্তি দেন আজ তিরিশ বছর ধরে দুর্গা পুজোয় এই বাড়িতে থাকছি, এমন একটাও দুর্গা পঞ্চমী যায়নি যে রাতে মায়ের নূপুর ধ্বনি শুনিনি তখন বাইরে বেরোনো নিষেধ থাকে মা আপন খেয়ালে ঘুরে বেড়ান সদর দরজা খোলা থাকে, দারোয়ান থাকে না ওইদিন গ্রামে কোনো অপরাধ হয় না, হলে মা তার বিচার করেন মা পাতাল ভৈরবের মন্দির অবধি চলে যান, তারপর ভোলানাথ তাকে বুঝিয়ে শান্ত করে আবার ফিরিয়ে আনেন বিশ্বাস করলে করবে, না করলে করবে নাবলে নীলমণি উঠে দাঁড়াল, তারপর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে থালাটা ধুতে চলে গেল

তিন

দেখতে দেখতে চতুর্থী এসে গেল গুজু আর বাতাসি এবার জেদ ধরেছিল দাদুর সঙ্গে পুজোর সময় জমিদার বাড়িতে থাকবে তাদের মনের মাঝে খুব ইচ্ছে সেই নূপুর ধ্বনি শুনবে কিন্তু নীলমণির প্রবল আপত্তি এতে এইটুকু বাচ্চা রাতে মাকে ছেড়ে থাকতে পারবে নাকি! তারপর রাতবিরেতে কান্নাকাটি জুড়ে একশা করবে তাছাড়া সে তার ছেলে পুজোর সময় এই বাড়িতে থেকে যায় কারণ নানান কাজে তাদের সাহায্য লাগে তাই বলে পরিবারের সদস্যদের এখানে এনে রাখাটা সম্পূর্ণ নিষেধ
কিন্তু ছোটোকর্তা শুনে বললেন, আহ নীলমণিদা, থাকুক না ওরা এই ক’দিন এখানে, আনন্দ করবে, হুটোপাটি করবে আর তুমি বরং বউমাকেও নিয়ে এসো এখানে আমার কোনো আপত্তি নেই
নীলমণি নিমরাজি হলেও মনে মনে খুশিই হল নাতি নাতনিকে ছেড়ে উৎসবে থাকলেও আনন্দে থাকা যায় না
এদিকে আবার তৃতীয়ার দিনই শুভ তার এক বন্ধুকে নিয়ে হাজির তারা নাকি পুজোয় এখানে থেকে গ্রাম বাংলার পুজোর আমেজটা ক্যামেরাবন্দি করবে তারা নীলমণিকে গিয়ে ধরল যাতে বাড়ির কর্তাকে বলে পুজোর ক’টা দিন জমিদার বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা করা যায় নীলমণির মাথার চুল এমনি এমনি সাদা হয়নি জীবনের অভিজ্ঞতা তার ভরপুর সে জানে এরা আসলে পঞ্চমীতে মায়ের নূপুর ধ্বনি শুনতে চায়
নীলমণি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিল, এই ব্যাপারে সে কিছুই করতে পারবে না, তারা যেন কর্তাবাবুর সঙ্গে গিয়ে কথা বলে
সেখানে কথা বলেও খুব একটা সুবিধা হল না শুভ আর তার বন্ধু জমিদার বাড়িতে থাকার অনুমতি পেল না তবে পুরোনো খাজাঞ্ছি বাড়ির একটা ঘর পরিষ্কার করে সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা কর্তাবাবুই করে দিলেন সেই বাড়িটা জমিদার বাড়ির মূল চত্বর থেকে বেরিয়ে, পুব দিকের পোদ্দার পুকুরের পাশ দিয়ে, বাঁশ বাগানের ছায়াঘন, শুকনো পাতা ঝরা কাঁচা রাস্তা ধরে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ সেই পথ দিয়ে হাঁটলে শুকনো পাতায় মড়মড় শব্দ হয়, হাওয়ার খেলায় বাঁশবাগানের আনাচে কানাচে সড়সড় শব্দ জাগে দিনের বেলাতেই কেমন গা ছমছম করে ওই পথে যেতে

পঞ্চমীর দিন সকাল থেকেই গুজু আর বাতাসি ছটফট করতে শুরু করল তাদের উৎসাহের যেন সীমা পরিসীমা নেই
গুজু বলল, শোন, আজ রাতে ছোটো বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে কাটাবি না অনেক কাজ আছে জেগে থাকতে হবে
বাতাসি মুখ ভেংচিয়ে বলল, উঃ, আমি নাকি বাচ্চা রাতে ঘুম ভেঙে মা-কে না দেখতে পেলে তো কেঁদে ভাসাস
মোটেই না, গুজু প্রতিবাদ করল, আমি ভয় পাই না আজ জাগতে হবে রাতে চুপিচুপি মায়ের পাশ থেকে উঠে ঠাকুর দালানে আসতে হবে
কী বুদ্ধি, আর মা তো টেরই পাবে না, তাই নাবাতাসি আবার মুখ ভেংচাল
গুজু এবার চিন্তায় পড়ল আজ রাতে নিশ্চয়ই অনেকেই জেগে থাকবে মায়ের নূপুর ধ্বনি শুনবে বলে তাহলে কী করা যায়?
বাতাসি গুজুর অবস্থা দেখে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, এই নাকি বড়ো হয়েছে শোন, দাদু আজ সকালেই মাকে বলেছে - যাই হয়ে যাক বউমা, নূপুর ধ্বনি শুনে খবরদার বাইরে যাবে না, যতক্ষণ মা ঠাকুর দালানে হেঁটে বেড়াবেন, গড় হয়ে প্রণাম করে থাকবে মা আমায় একই কথা বলেছে যে গড় হয়ে প্রণাম করে থাকতে
তো?”
আরে বাবা! মাকে তো চিনিস ঠাকুর দেবতার ব্যাপার দেখবি মা সময়ের আগেই ঠাকুরের ছবির সামনে চোখ বন্ধ করে বসে পড়েছে তখন পা টিপে বেরিয়ে আসব একবার বেরিয়ে এলে তো কেউ আটকাতে পারবে না আজ দুর্গা মাকে দেখবই
বাতাসির কথায় গুজু মনে বেশ বল পেল ইতিমধ্যে শুভ আর তার বন্ধুও সেখানে হাজির হল তারা বাতাসিদের কিছু ছবি তুলল আর জানাল রাতে যেহেতু এখানে থাকতে পারবে না তাই তাদের মন খারাপ বাতাসি আর গুজু যেন আজ রাতে নূপুর ধ্বনি শোনার অভিজ্ঞতা আগামিকাল তাকে বিস্তারিত বলে, এতে তার ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার বাড়বে
গুজু আর বাতাসি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও তাদের আসল প্ল্যানটা শুভকে বলল না বলা যায় না যদি দাদুকে গিয়ে সব বলে দেয়

রাতে ঠাকুর দালানের বেশিরভাগ আলো নিভে গেল আশেপাশের সমস্ত ঘরের আলো যথাসম্ভব নিভিয়ে দরজা জানলা ভেজিয়ে দেওয়া হল মাতৃপ্রতিমার কাছে কয়েকটি মৃদু আলো ছাড়া সারা ঠাকুরদালান সংলগ্ন উঠোনে এক অদ্ভুত আলো আঁধারি খেলা করছে
বাতাসি ঠিকই ধরেছিল, এখনও রাত্রি দ্বিপ্রহরে পৌঁছোতে কিছু সময় বাকি মা দুর্গা ঠাকুরের একটা ছোটো ছবির সামনে চোখ বন্ধ করে হাতজোড় করে বসে রয়েছে, একমনে ঠাকুরের নাম নিচ্ছে অন্য কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই
দুই ভাইবোন চুপিচুপি পা টিপে ঘরের বাইরে এল চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা টানা চাতালে কোনো জনপ্রাণী নেই চরাচর যেন এক মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যে অধীর অপেক্ষায় ব্যাপ্ত চুপিসারে দুই ভাইবোন ঠাকুর দালানে এসে একটা থামের পিছনে লুকিয়ে থাকল
আর বেশি সময় বাকি নেই গুজু আর বাতাসির মনে তখন উত্তেজনার পারদ চড়ছে হঠাৎ কিছু পায়ের শব্দ পাওয়া গেল শুধুই পায়ের শব্দ, নূপুরের নয় গুজু আর বাতাসি টানটান হয়ে বসল নিস্তব্ধ ঠাকুর দালানে যেন একটা খসখস শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে
সব গয়না ব্যাগে ঢোকানো হয়েছে? কিছু বাকি রয়ে গেল না তো?”
না, না সব নিয়েছি গয়নাগুলোর যা ওজন বিক্রি করলে কত দাম হবে, উফ, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে
যা ভাবছিস তার থেকে অনেক বেশি পাবি সব গয়না অ্যান্টিক আজ বলেই এত সহজে কাজটা হচ্ছে, অন্যদিন হলে মাছিও গলতে পারত না
যা প্ল্যান বানিয়েছিস, উফ অন্যান্য দিন সদর দরজা বন্ধ থাকে দারোয়ান থাকে কিছু লোকজন সব সময়ই যাতায়াত করে ঠাকুর দালানেও পাহারা থাকে আর আজ এত গয়না সব মায়ের নামে ছেড়ে রেখেছে, দরজা খোলা, একটাও লোক ঘরের বাইরে নেই এত বছরে একটাও চুরি হয়নি এটাই আশ্চর্য
এতদিন গ্রামের লোকেদের গল্প শুনিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিল আমরা তো আর অত বোকা নই চটপট চল সকাল হওয়ার আগেই অনেক দূরে পালাতে হবে
গুজু ফিসফিস করে বাতাসিকে বলল, চোর ঢুকেছে তো চিৎকার করে সবাইকে ডাকব?”
বাতাসি কিছু বলার আগেই লোকদুটো ঠাকুরদালানের সামনে এসে দাঁড়াল সেখানকার নরম আলোয় গুজু বাতাসি লোকদুটোকে দেখতে পেল শুভদা আর তার বন্ধু!
ভাইবোন দুজনেই ছুটে গিয়ে পথ আটকাল, শুভদা তুমি ঠাকুরের গয়না চুরি করছ? সব গয়না রেখে দাও, নয়তো আমরা চিৎকার করে সবাইকে ডাকব
শুভ হঠাৎ করে দুই ভাইবোনকে সামনে দেখে চমকে উঠেছিল শুভর বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে একটা বন্দুক বের করে গুজুর মাথায় ঠেকাল, তারপর শুভকে রাগ মেশানো গলায় বলল, আগেই বলেছিলাম বাচ্চাগুলোর সঙ্গে অত দোস্তি করিস না পুঁচকে বাচ্চা, মায়ের পাশে ঘুমোবে তা না, ঠিক রাতের বেলায় পিছু নিয়েছে নে, এবার চিনে ফেলেছে আমাদের পুলিশকে বলে দিলেই সব চৌপাট হয়ে যাবে
শুভ বাতাসির মুখ চেপে ধরল তারপর কাঁপা গলায় বলল, কী করব এখন?”
এখান থেকে এই দুটোকেও নিয়ে চল কাশবনের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা পাতাল ভৈরবের মন্দিরে গেছে সেইদিকে গিয়ে দুটোকে মেরে কাটি ভৈরবের খাতে ফেলে দেব
মেরে দেব? এতটুকু বাচ্চা
না মারলে মুখ বন্ধ করবি কী করে?”
এই কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ চারপাশটা কেমন পরিবর্তন হতে শুরু করল শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল অদ্ভুত এক সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে
কী কী হচ্ছে এইসব?” শুভ আতঙ্কিত গলায় বলল
ঠিক সেই সময় নূপুরের ঝমঝম শব্দ ছড়িয়ে পড়ল ঠাকুরদালান জুড়ে কেউ যেন ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে ঠাকুর দালানে আলো আঁধারিতে কিছু দেখা যাচ্ছে না ক্রমশ সেই পদক্ষেপ দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকল কেউ যেন অশান্ত হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে
একটা মিহি কুয়াশার জাল ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে সেই কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠতে লাগল একসময় দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে পৌঁছে গেল সেই কুয়াশার মধ্যেও নূপুরের ধ্বনি কানে আসতে লাগল সকলের
তারপর হঠাৎ এক দমকা হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই কুয়াশার জাল ছিন্ন হল সকলে অবাক হয়ে দেখল তারা আর জমিদার বাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে নেই আকাশে তখন পঞ্চমীর আংশিক চাঁদ সেই চাঁদের তরল আলো ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশে চারপাশে মানুষ সমান উঁচু কাশের বন আঁধারে চোখ একটু সয়ে এলে দেখা গেল একটু দূরেই পাতাল ভৈরবের মন্দিরের চূড়া
শুভ এতটাই অবাক হয়েছিল যে নিজের অজান্তেই বাতাসিকে ছেড়ে দিয়েছিল শুভর বন্ধুও হতচকিত হয়ে বন্দুকটা গুজুর কপাল থেকে নামিয়ে দিয়েছিল এই সুযোগে গুজু লোকটাকে এক ঠেলা মেরে বাতাসির কাছে দৌড়ে চলে এল
শুভ কাঁপা গলায় বলল, এটা কোথায় এলাম? বাচ্চা দুটোকে ছেড়ে তাড়াতাড়ি পালা
দ্বিতীয় লোকটা আতঙ্ক মেশান গলায় বলল, বুঝতে পারছি না, তবে বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দেওয়া যাবে নাএই বলে গুজুর দিকে বন্দুক তাক করল ঠিক তখনই আবার নূপুরের ধ্বনি শোনা গেল বাতাসি দেখল লোকটার ঠিক পিছনে কাশবনের মধ্যে দিয়ে একটি কিশোরী মেয়ে হেঁটে আসছে চাঁদের আলো যেন হঠাৎ বেড়ে গেল চরাচর জ্যোৎস্নায় প্লাবিত হচ্ছে কিন্তু আজ তো পূর্ণিমা নয়! কাশবন জুড়ে সাদা ঢেউ খেলে যাচ্ছে মেয়েটি শ্যামবর্ণা, গায়ে লাল পাড় সাদা শাড়ি আঁটো করে পড়া, পায়ে নূপুর আর হাতে লম্বা একটা কিছু রয়েছে, যার মাথাটা ছুঁচলো, জ্যোৎস্নায় সেটা চকচক করছে
লোকটা গুজুর দিক থেকে পিস্তলের মুখটা মেয়েটির দিকে তাক করল মেয়েটি ক্রমশ এগিয়ে আসছে, তার মুখমণ্ডলে ক্রোধ যেন চুঁইয়ে পড়ছে, চোখদুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে
এই মেয়ে, আর এক পাও এগোবি না গুলি করে দেবলোকটা কাঁপা গলায় বলল কিন্তু পরক্ষণেই কিছু বুঝে ওঠার আগে মেয়েটি লাফিয়ে উঠে হাতের ছুঁচালো অস্ত্রটি লোকটির বুকে গেঁথে দিল লোকটা মরণ চিৎকার করে মাটিতে পড়ে, ছটফট করতে করতে একসময় স্থির হয়ে গেল
মেয়েটি এবার শুভর দিকে এগোতেই সে আতঙ্কে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চিৎকার করে উঠল, “আমায় মেরো না মা, আমায় মেরো না
সেই মুহূর্তে আবার কুয়াশা গ্রাস করল সমস্ত চরাচর বাতাসি আর গুজুর চোখে হঠাৎ করেই যেন গভীর ঘুম নেমে এল
দুই ভাইবোনের যখন ঘুম ভাঙল তখন তারা ঠাকুর দালানে শুয়ে আছে চারপাশে বাড়ির লোকেরা জড়ো হয়েছে নীলমণি, তার ছেলে বউমা, ছোটোকর্তা সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে দুই ভাইবোনের দিকে বাতাসি তাড়াতাড়ি উঠে বসল সে মায়ের মূর্তির দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল গয়নাগুলো সব যেমন থাকার তেমনই আছে
সে দাদুকে বলল, গয়না কে ফেরত দিল? ওগুলো তো শুভদা নিয়ে পালিয়েছিল
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল নীলমণিই বলল, দিদিভাই গয়না তো চুরি হয়নি, তবে একটা কাণ্ড হয়েছেতোমার শুভদাকে আজ সকালে সবাই পাতাল ভৈরবের মন্দিরে খুঁজে পেয়েছে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে বিড়বিড় করে বলছিলমা আমায় ক্ষমা কর সবাই তাকে পুলিশ স্টেশনে দিয়ে এসেছে
পুলিশ স্টেশনে?”
নীলমণি কথা এড়িয়ে গেল, সব তোমার না জানলেও হবে দিদিভাই তোমরা ঘরে যাও, পরে শুনব এখানে রাতে তোমরা কী করছিলে
নীলমণিকে কথাটা এড়িয়ে যেতেই হত কী করে সে বলত যে বাতাসি আর গুজুর শুভদাকে তার বন্ধুর খুনের দায়ে পুলিশ গ্রেফতার করেছে
বাতাসি গুজুকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঘরে চলে গেল সে জানে কাল সে যা দেখেছে তা কাউকে বলা যায় না, ওসব কাউকে বলতে নেই
----------
ছবি - শুভশ্রী দাস

No comments:

Post a Comment