প্রবন্ধ:: আজও রহস্য - সুলগ্না ব্যানার্জ্জী

আজও রহস্য
সুলগ্না ব্যানার্জ্জী

ম্যাজিক ল্যাম্প’-এর ছোট্ট বন্ধুরা, এবারের ছুটি ছুটি সংখ্যায় কোনো নতুন বই নয়, নিয়ে এলাম তোমাদের জন্য এমন কিছু অজানা রহস্যময় ঘটনা যাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য আজও উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি, পাওয়া যায়নি এমন কোনো ব্যক্তিকে যাঁরা সঠিক তথ্য দিয়ে এসব রহস্যের ওপর থেকে পর্দা তুলবেন কথায় বলে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’! কে কতটা বিশ্বাস করবেন বা আদৌ করবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আমাদের রহস্যসন্ধানী মন কিন্তু এইসব রহস্য নিয়ে বরাবর আগ্রহী তাই আর দেরি না করে শুরু করা যাক


দ্য অ্যানট্রাম (The Antrum)
কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে বিজ্ঞান আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু রহস্য যে বিশ্বের বড়ো বড়ো বৈজ্ঞানিকদের কাছেও অজানা তা তাঁরা সহজেই স্বীকার করেছেন
একটা সময় ছিল যখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক চলচ্চিত্র হিসেবেদ্য এক্সরসিস্ট-কে গণ্য করা হত এবং এই ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছিল দর্শকদের প্রাণ যাওয়ার বা অসুস্থ হয়ে যাবার মতো তথ্যও ফলে একসময় ছবিটি প্রদর্শন বন্ধ হয় এবং পরে তা পুনরায় দেখানো শুরু হলেও কিয়দংশ বাদ যায় কিন্তু আজ এই ছবিটি নয়, আমি তোমাদের এমন এক চলচ্চিত্রের কথা জানাব যা বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ চলচ্চিত্র এবং তদুপরি অভিশপ্ত বলে গণ্য করা হয় ছবিটির নাম অ্যানট্রাম.... কেন এটি অভিশপ্ত? যে কোনো ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগে পাঠানো হয় বেশ কিছু চলচ্চিত্র উৎসবে অ্যানট্রাম-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি তবে অনেক উদ্যোক্তাই এই ছবিটি দেখাতে চাননি আর এর ঠিক পরেই ঘটে হাড় কাঁপানো সেই ঘটনা যাঁরা ছবিটি দেখাননি সেই সব চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্যোক্তাদের আচমকাই রহস্যময় মৃত্যু হতে থাকে শুধু কি তাই….! ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যানট্রাম ১৯৮৮ সালে বুদাপেস্টের এক প্রেক্ষাগৃহে দেখানোর সময় ছবি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেক্ষাগৃহে আগুন লেগে পুড়ে মারা যান প্রায় ৫৬ জন মানুষ
ঘটনার প্রারম্ভে অনেকেই ভেবেছিলেন প্রজেক্টরে যান্ত্রিক গোলযোগ হয়তো ছিল, কিন্তু খুব দ্রুত তাঁরা বোঝেন ছবিটি যেমন না দেখানো উদ্যোক্তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে তেমন দেখালেও ঘটতে পারে দুর্ঘটনা তাই বেশ কিছু বছর ধরে ছবিটা নিয়ে আলোচনা বন্ধ থাকার প্রায় পাঁচ বছর পর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রেক্ষাগৃহে পুনরায় দেখানো হয় ছবিটি এবং এবারেও শুরু হয় এমন এক ঝামেলা যে প্রেক্ষাগৃহেই পদপিষ্ট হয়ে মারা যান জনা তিরিশেক দর্শক টনক নড়ে সকলের এবং তৎক্ষণাৎ বন্ধ করা হয় ছবিটির প্রদর্শন তারপর থেকে আর কোনো প্রেক্ষাগৃহে ওই ছবি দেখানো হয়নি পরবর্তীতে ২০১৮ সালে নতুনভাবে ওই ছবিটি মুক্তি পেলে নতুন টিমের সদস্যদের দাবি ছিল যে পুরোনো ছবিটি তৈরি করার সময় তাতে এমন কিছু অদ্ভুত চিহ্ন, শব্দ ও সংকেত ব্যবহার করা হয়েছিল যেগুলি নরকের দরজা খুলে দেয় এবং অশুভ শক্তির আবাহন করে নতুন টিম ছবি থেকে তাই অনেক কিছুই বাদ দেয় ফলে বর্তমানে ছবিটির ক্ষেত্রে প্রাণনাশের খবর নেই কিন্তু আসল ছবির ভয়াবহ রহস্য আজও ভেদ হয়নি বলেই আজও চলচ্চিত্র জগতে অভিশপ্ত চলচ্চিত্রের তকমা পায়অ্যানট্রাম


বাসানোর ফুলদানি
বন্ধুরা, পুজোর ছুটি মানেই নিজেদের সাজের পাশাপাশি বাড়িঘরেরও একটু আধটু সাজসজ্জা ছোটোবেলায় দেখতাম এই সময় পুজোর বাজার করতে গিয়ে বেঁচে যাওয়া টাকা থেকে দরদাম করে ছোটোখাটো এটা ওটা সেটা শখ করে কিনে আনা হত বাড়িতে কখনও বা ছোট্ট ফুলদানি তো কখনও ময়ূরের পালকের তৈরি ছোটো হাতপাখা, কখনও হাতে বোনা মাদুর ইত্যাদি আজও হয় তো তোমাদের অনেকের বাড়িতে এ নিয়ম আছে কিন্তু ধরো তোমার শখ করে কিনে আনা ঘর সাজানোর জিনিসটি যদি তোমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে ভয় দেখায়, তখন…! হ্যাঁ, এবার এইরকমই একটি অভিশপ্ত অথচ খুব সাধারণ মানেরফুলদানি’-র রহস্য জানাব তোমাদের এই ফুলদানিটির পিছনের কিংবদন্তি - পঞ্চদশ শতকে ইতালির নেপলসে বিয়ের সময় এক অল্পবয়সি বধূকে উপহার হিসেবে এটি দেন তাঁর কোনো আত্মীয় কিন্তু সেই রাতেই বধূটি রহস্যজনকভাবে মারা যায় এবং মৃত্যুর পর তাঁর আশেপাশে কোথাও ফুলদানিটি পাওয়া যায় বধূটির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অন্য কেউ ফুলদানিটি সংরক্ষণের চেষ্টা করলে তাঁরও মৃত্যু হয় ফলে ওই পরিবার ফুলদানিটি আর বাড়িতে রাখেনি পরবর্তীকালে ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, উক্ত ফুলদানিটি বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরেই অনেক মানুষের রহস্যময় মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছিল অতঃপর ১৯৮৮ সালে ফুলদানিটি নিলামে তোলা হলে বিজয়ী ক্রেতাও ফুলদানিটি কেনার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে মারা যায় এবং ফুলদানিটি তাঁর মৃতদেহের পাশ থেকেই উদ্ধার হয় তারপর যতবার ফুলদানিটি নিলামে তোলা হয়েছে ততবার বিজয়ী ক্রেতাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে মাসখানেকের মধ্যে ফলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন কোনো অভিশাপ হয়তো জড়িয়ে আছে ফুলদানিটির সঙ্গে বর্তমানে ওই ফুলদানিটি কোথায় তা কেউ জানে না, বিশ্বের কোনো জাদুঘর ফুলদানিটি সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়নি তবে এই বিশিষ্ট ফুলদানিটি নিয়ে এটুকুই জানা যায়, মানুষের চোখের আড়ালে এমন কোথাও ফুলদানিটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছে যাতে সেটি আর কারোর ক্ষতি সাধন করতে না পারে


বার্নার্ডো ডি গালভেজের প্রতিকৃতি
এবার যে রহস্যের কথা বলব তা একটিপেইন্টিং’-কে ঘিরে কার পেইন্টিং…? একজন স্প্যানিশ সামরিক নেতা যাঁর নাম বার্নার্দো দে গালভেজ যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের পাশাপাশি যুদ্ধ করে আমেরিকাকে স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি নিজের সামরিক অভিযান মিসিসিপি রাজ্য থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি বাহামাসে একটি ব্রিটিশ নৌ ঘাঁটি পর্যন্ত নিয়েছিলেন আমেরিকান বিপ্লবের পর, বার্নার্ডো দে গালভেজ স্পেনে ফিরে যান যেখানে তাঁকে মেজর জেনারেল করা হয় দুই বছরেরও কম সময়ের জন্য নিউ স্পেনের ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ১৭৮৬ সালে তিনি মেক্সিকো সিটিতে মারা যান তবে আসল ঘটনার সূত্রপাত অবশ্যই তাঁর মৃত্যুর পর থেকে টেক্সাসের গ্যালভেস্টনের গ্যালভেজ হোটেলের কোনো একটি ফ্লোরের করিডোরে রয়েছে তাঁর একটি পেইন্টিং অলৌকিক কার্যকলাপের জন্য একটি কুখ্যাত কিংবদন্তি রয়েছে এই হোটেলের বিভিন্ন সূত্রে বলা হয় যে হোটেলটি আজও একদল আত্মার আবাসস্থল এবং প্রায়ই হোটেলে এসে থাকা ব্যক্তিরা নানান অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন একটি করিডোরে রাখা একটি বিশেষ পেইন্টিংয়ের চারপাশে বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেস্টরা যখন সেই রহস্যের সন্ধান শুরু করেন তখন প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করে তাঁরা গালভেজের পেইন্টিংয়ের খুব কাছে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের সাহায্যে তাঁরা একটি অদ্ভুত শীতল উপস্থিতিও অনুভব করেছিলেন মনে হয়েছিল গালভেজের প্রতিকৃতিই সেসব ঘটনা ঘটিয়েছে তাঁরাও প্রতিকৃতিটি ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা করেন কিন্তু তাঁরা সফল হতে পারেননি তবে এটুকু বুঝতে পেরে ছিলেন পেইন্টিং-টি কোনো সাধারণ পেইন্টিং নয় পরবর্তীকালে হোটেল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে জানা যায় অনেকেই নাকি ফ্ল্যাশ সহযোগে এই প্রতিকৃতির ছবি তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন ছবিটি প্রতিবার ডেভেলপ হয়ে আসার পর সেখানে একটি নরকরোটি ফুটে ওঠে বলে অনেকের দাবি স্থানীয় কিংবদন্তি, কেউ যদি প্রয়াত সেনাধ্যক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ করেন একটি ছবি তোলার জন্য, তাহলেই নাকি তিনি সফল হন এবং কোনো গণ্ডগোল ঘটে না এই ছবি কেবলমাত্র টেক্সাসের গ্যালভেস্টনের গ্যালভেজ হোটেলেই বিদ্যমান কেউ এই পেইন্টিং-এর ছবি নিজের বাড়িতে লাগালে তা প্রাণঘাতী বলেও আশঙ্কা করা হয়

বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এমন অনেক রহস্যই আছে যাদের ওপর থেকে আজও সরানো যায়নি সমাধানের পর্দা দীর্ঘসময় ধরে রহস্যের আড়ালে থাকতে থাকতে তারাও সাধারণ জনশ্রুতির গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে কিংবদন্তিতে কবির কথায় - ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানিযেন বেদবাক্য বিপুলা পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক রহস্যের কিয়দংশ আজ এই নিবন্ধের মাধ্যমে তোমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম কেমন লাগল জানাতে ভুলো না বন্ধুরা আগামী দিন সকলের খুব ভালো কাটুক

তথ্যসূত্র:



----------
ছবি - আন্তর্জাল

1 comment:

  1. খুব তথ্যপূর্ণ লেখা। অনেক অজানার সন্ধান পেলাম এবং একইসাথে শিউরে উঠলাম। কিন্তু পড়ে কখনোই ক্লান্ত হইনি।

    ReplyDelete