গল্প:: রাজগৃহ রহস্য - বুমা ব্যানার্জী দাস


রাজগৃহ রহস্য
বুমা ব্যানার্জী দাস

১৮৭২, রাজগীর
বৈভার পর্বতের পাদদেশ থেকে সামান্য উপরে তাঁবু খাটিয়ে বসে আছেন তিনজন শেতাঙ্গ পুরুষ তাঁদের মধ্যে একজন ইংরেজ, বাকি দুইজন মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা চারপাশের জঙ্গল, কাঁটাঝোপ পেরিয়ে দৃষ্টি চলে না প্রায় সদ্যপ্রতিষ্ঠিত আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সর্বেসর্বা স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহাম তাঁর সহযোগী বেগলারকে বললেন কী বুঝছ জোসেফ, এখনও তো তেমন কিছু
মার্কিনি জোসেফ বেগলার সপ্রতিভ গলায় বলে চলুন, আরও নীচের দিকে নামি তবে যা ঘন জঙ্গল, আশা করি শেয়াল, হরিণ বাদে বন্য প্রাণী কিছু নেই
উষ্ণ প্রস্রবণের সাতটি ধারা এখান থেকে দেখা না গেলেও তার জলকণা গাছের মাথায় ওড়নার মতো দুলছে শেষ বিকেলের আলোতে আশ্চর্য মায়াময় লাগছে সে দৃশ্য সেদিকে তাকিয়ে কানিংহাম বলেন হিউয়েন সাঙের লেখা অনুযায়ী এখানে আরও দুটো গুহা থাকার কথা কাল খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ব আমরা
জোসেফ বেগলারের পাশে বিরক্তমুখে বসে ছিল তার খুড়তুতো ভাই, আর্নল্ড বেগলার রোজগারের ধান্ধায় দাদার কাছে এসেছে কয়েক মাস হল বয়স অল্প হলেও ছোকরার গুণ আছে অনেক ব্রাহ্মী লিপি, বিশেষ করে গুপ্ত যুগের নব্য ব্রাহ্মী বা গুপ্ত লিপি গড়গড় করে পড়তে পারে তবে প্রত্নতত্ত্বে তার বিশেষ উৎসাহ নেই সে ভেবেছিল এই সব প্রাচীন গুহা-টুহাতে নির্ঘাত গুপ্তধন পাওয়া যাবে রাজা রাজড়াদের ব্যাপার, দু-একটা দামি পাথর, সোনা দানা কি আর পাওয়া যাবে না কিন্তু কানিংহাম আর তার দাদা খালি মাপজোক, ভাঙা মূর্তি, প্রাচীন পুঁথি এসব নিয়েই ব্যস্ত জেহানাবাদের বারাবার গুহার শিলালিপিগুলো কত উৎসাহ নিয়ে পড়ল সে, কোথায় কী এখন এই জঙ্গলের মাঝে আবার কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে কে জানে ব্যাজার মুখে নীচের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকে আর্নল্ড কানিংহাম ততক্ষণে জোসেফের সঙ্গে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় ডুবে গেছেন

রাজগৃহ, খ্রিস্টপূর্ব ৫১১
তিনি এসেছেন নয় বছর পর পুনরায় এসেছেন রাজগৃহে তখন তিনি ছিলেন রাজপুত্র, রাজ্যত্যাগী হলেও রাজপুত্র তো বটে নাম বলেছিলেন, গৌতম মগধনরেশ শুনেছেন এখন তাঁকে সকলে বলে বুদ্ধ, তিনি বোধি লাভ করেছেন বোধির অর্থ তো জ্ঞান, এই জ্ঞানের সন্ধানেই তখন রাজগৃহে থাকতে রাজি হননি তিনি বলেছিলেন সেই অনন্ত সত্যের সন্ধান পেলে একবার ফিরে আসবেন মগধসম্রাটের নিকট এতদিনে সেই প্রতিজ্ঞা পালনের সময় হল তাহলে সেদিন ছিলেন একা, আজ বেণুবনে সশিষ্য আশ্রয় গ্রহণ করেছেন মগধসম্রাট বিম্বিসারের চোখ সজল হয়ে ওঠে
- আমি ধন্য, তৃপ্ত সম্রাটের দৃষ্টি যেন ফিরতে চায় না আর যে গৌতমকে সৌহার্দ্যের বন্ধনে আটকাতে চেয়েছিলেন, ইনি যেন তাঁর থেকে আরও অনেক, অনেক বেশি এত আলো, এত শান্তি ওই চোখ দুটোর অমল দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না কী বলে সম্বোধন করবেন তাই নিয়ে বড়োই দ্বিধায় পড়েছিলেন সম্রাট তিনি স্মিতহাস্যে বলেছেন তথাগত বলে ডাকতে

সংঘের শতাধিক ভিক্ষু এসেছেন তাঁর সহযাত্রী হয়ে সকলেই পথশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় ভারাক্রান্ত যদিও তাঁদের শান্ত মুখশ্রীতে সে ক্লান্তির চিহ্নমাত্র ছিল না সম্রাট ও পট্টমহাদেবী লিচ্ছবীকন্যা চেল্লনাদেবী স্বহস্তে তাঁদের সেবা করে নিজেদের ধন্য মনে করেছেন রাজভোগে রুচি নেই ভিক্ষু শ্রমণদের, সামান্য আয়োজনেই তাঁরা পরিতৃপ্ত তথাগতের জন্য সুবর্ণ কলস ভরে কর্পূরমিশ্রিত জল এনেছিলেন চেল্লনাদেবী, তিনি স্পর্শও করেননি পান করেছেন ব্রহ্মকুণ্ডের জল
- এই বেণুবন আজ থেকে আপনার, আমি সংঘের ব্যবহারের জন্য এই উদ্যানভূমি দান করতে চাইপ্রসন্ন কণ্ঠে ঘোষণা করেন বিম্বিসার
স্মিতহাস্যে আলোকিত হয় তাঁর মুখ, শান্ত গম্ভীর স্বরে আশ্বাস দেনগ্রহণ করলাম
সুবর্ণ কলসের সুগন্ধী জল এতক্ষণে কাজে লাগে দান গ্রহণের প্রথা অনুযায়ী তথাগত তাতে দুই হাতের পাতা ডুবিয়ে দেন যেন দুটি পদ্মের কলি ভাসতে থাকে জলের ভিতর সেই পবিত্র বারিধারা সমেত সোনার কলসিটি নিজের কাঁধে তুলে নেন সম্রাট পূর্ণ হৃদয় নিয়ে ফিরে চলেন প্রাসাদে

সহসা কড়কড় আওয়াজে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকান তথাগত এতক্ষণের নীলকান্ত মণির মতো আকাশ হঠাৎ ঘন কালো মেঘে সমাচ্ছন্ন পূর্ণচাঁদের মতো ললাটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে তাঁর পাশে বসা অল্পবয়সি শ্রমণের দৃষ্টি এড়ায় না তাঁর এই ললাটের অস্বাভাবিক কুঞ্চন সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি উদ্বিগ্ন হবেন, এ বিশ্বাসযোগ্য নয়
- ভন্তে, আপনি কি কোনো কারণে উদ্বিগ্ন? – দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্নটা করেই ফেলে সে
- বৎস কুন্দন, মগধের উপর নেমে আসবে এক অপরিসীম কলঙ্ক, প্রকৃতি বোধহয় আজ তারই ইঙ্গিত বহন করছেসুদুরপ্রসারী চোখ দুটি আকাশের দিকে তুলে তিনি বলেন

১৮৭২, রাজগীর
খুব বড়ো গাছের জঙ্গল এ নয়, কিন্তু কাঁটাঝোপ, পাথুরে জমি আর মাঝারি গাছের ঘন সারিতে রাস্তা বের করা দায় হঠাৎ ধোঁয়ার গন্ধ নাকে আসায় তিনজনেই দাঁড়িয়ে পড়েন জঙ্গলে আগুন জ্বেলেছে কেউ এমনিতে সঙ্গে কুলির দল, রাঁধুনি, বেয়ারা থাকে, কিন্তু কানিংহাম ভেবেছিলেন এই কাজটা এক দিনের মধ্যে সারা যাবে, তাই কাউকে আর সঙ্গে নেননি সতর্কভাবে ধোঁয়া লক্ষ করে এগিয়ে যান কানিংহাম এদিকে ডাকাতের অভাব নেই
অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার একটা অংশে কাঠ আর শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে পাগলাটে চেহারার একটা লোক কানিংহাম এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন এই তুমি কে? এখানে কী করছ? – হিন্দিটা মোটামুটি ভালোই বলেন তিনি বাকি দুইজন বলতে না পারলেও বুঝতে পারে
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, কিন্তু সাহেব দেখেও ঘাবড়ে যায় না তেজের সঙ্গে উত্তর দেয় আমি এখানেই থাকি, দেখছ না ভাত সেদ্ধ করছি কাঠ বেচে দুটি চাল এনেছিলাম কাল তোমরা কারা? বিদেশিদের এখানে আসা মানা, জানো না?
- আমরা বিদেশি হলেও এই দেশেরই কাজ করছি শুনেছি এখানে দুটো গুহা আছে, কোথায় জানো?
লোকটার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়, কেমন একটা গলায় বলে সোন ভাণ্ডার? ওখানে অনেক ধনরত্ন আছে, যেতে নেইকথাটা বলেই ফুটন্ত ভাত ফেলে লোকটা দৌড়ে পালাতে যায় আর্নল্ড এক লাফে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে লোকটা ছাড়ানোর জন্য প্রবল ধস্তাধস্তি শুরু করলে জোসেফ এসে চেপে ধরে তার আর একটা হাত
- তোমার কোনো ভয় নেই, শুধু গুহার রাস্তা দেখিয়ে দাও ধনরত্ন নেব না আমরাকানিংহাম লোকটার কাছে এগিয়ে গিয়ে নরম গলায় বলেন
- তোমরা চেষ্টা করলেও নিতে পারবে না হাত ছেড়ে দাও, রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি লোকটার গলায় যেন ঘৃণা ঝরে পড়ে

রাজগৃহ, খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২
গবাক্ষের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন বিম্বিসার চাঁদের মরা আলো এসে পড়েছে উন্নত রাজমস্তকে ধীরগতিতে চিন্তামগ্ন মগধসম্রাটের পিছনে গিয়ে দাঁড়ান পট্টমহাদেবী দূরে বৈভার পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসে একটু যেন কেঁপে উঠলেন রানি সেই সামান্য কম্পনও মহারাজের চিন্তার জাল ছিন্ন করতে সক্ষম হল যোদ্ধাকালের অভ্যেস এই সদা সচেতনতা
- কিছু বলবে? – নরম গলায় জিজ্ঞেস করেন মগধনরেশ নীরবে মাথা দোলান পট্টমহারানি
- বোধ করি পুত্র অজাতশত্রু সম্বন্ধে?
মুহূর্তে টানা টানা চোখ দুটি দপ করে জ্বলে ওঠে তীব্র কণ্ঠে মহারানি বলেনতাকে পুত্র বলতে আমার ঘৃণা বোধ হয়
ম্লান হাসেন মহারাজ লিচ্ছবীকন্যা বড়ো স্পষ্টবাদিনী তবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী লিচ্ছবীরা এরকমই এদের সম্পূর্ণরূপে বোঝেন না মগধনরেশ ভালো হোক কি মন্দ, সৎ হোক কি অসৎ, রাজার পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র পাবে সিংহাসনের অধিকার, তাই তিনি বোঝেন, তাতেই তিনি অভ্যস্ত লিচ্ছবীরা সেসবের ধার ধারে না, যাকে তারা উপযুক্ত মনে করে তাকে নির্বাচন করে সিংহাসনে বসায় ভারী অদ্ভুত এ পদ্ধতি, তবে এতে অনুপযুক্ত কেউ সিংহাসনে বসতে পারে না সেকথা স্বীকার করতেই হয়
- তথাগতর উপর বিশ্বাস রাখো মহারানি, ভয় কীসের?
- আপনার মতো বিশ্বাস আমার নেই মহারাজ
- তবে, নিজের ভ্রাতা শ্রী বর্ধমান মহাবীরের উপর বিশ্বাস রাখো, আমি জৈন ধর্মকেও সমান শ্রদ্ধা করি
দুই ধর্মকেই আপনি সমান শ্রদ্ধা করেন একথা সত্য, তবে ভালোবাসেন একমাত্র তথাগতকে
স্বীকার করার ভঙ্গিতে মাথা সামান্য নামিয়ে নেন বিম্বিসার তাঁর প্রাণ মন কর্তব্য সমস্তই তিনি বুদ্ধের চরণে নিবেদন করেছেন কতদিন দর্শন করেননি তাঁকে বর্ষার শুরুতে তিনি বৈশালী গেছেন, এখন শরৎ আগতপ্রায়

খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন মহারানি তারপর বলেনমহারাজ, প্রাসাদে আপনি নিরাপদ নন যুবরাজ আপনাকে বন্দি করে, সঞ্চিত সম্পদ গ্রাস করে সিংহাসনে আরোহণ করতে চায়
চমকে ওঠেন বিম্বিসার এ খবর তাঁর অজানা নয়, কিন্তু মহাদেবী জানলেন কী প্রকারে
- সে মগধের সিংহাসনে বসার পক্ষে সর্বাংশে অনুপযুক্ত, আত্মীয়বিরোধী তথাগত-ভ্রাতা দেবদত্তের প্ররোচনায় হীন কর্মে প্রবৃত্তরুদ্ধস্বরে বলেন দেবী চেল্লনা
- দেবদত্ত চায় সংঘের কর্তৃত্ব মগধের সম্রাটের সমর্থন পেলে সেই কর্তৃত্ব সহজেই তার করায়ত্ত হবে আমি জীবিত থাকতে তা অসম্ভব জেনেই যুবরাজের উপর প্রভাব বিস্তার করছে সে আর পুত্র অজাতশত্রু শিশুকাল থেকেই নিয়মবিরোধীআবার গবাক্ষের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ান মগধসম্রাট অজাতশত্রু নির্ভীক, দৃঢ়চেতা কিন্তু সেই সঙ্গে হঠকারীও বটে এই ধরনের মানুষের মন্ত্রণাদাতা কুমতলবী হলে সর্বনাশ উপস্থিত হয় এমনকি মাতুলবংশের সঙ্গেও তার বিরোধ সীমাহীন বৈশালীর নিকটস্থ এক ভূগর্ভস্থ হীরকের আকরকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত
- মহারাজ, লিচ্ছবীদের ন্যায় গণমতের মাধ্যমে আমরা পরবর্তী সম্রাট নির্বাচন করতে পারি না?
চমকে ওঠেন বিম্বিসার না, এ তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেন না সর্বশক্তি দিয়ে তিল তিল করে তাঁর নিজের হাতে গড়ে তোলা মগধ, তা কিনা, নানা এ অসম্ভব
- সে মহা দায়িত্ব গ্রহণ করার ন্যায় উপযুক্ত কেউ আছে কি, দেবীঈষৎ কঠিন শোনায় যেন মগধনরেশের কণ্ঠ তিনি বলে চলেনলিচ্ছবীরা বহুদিন ধরে এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত আমরা নই এখানকার প্রজাদের প্রত্যাশা ভিন্ন তারা জানে এই হর্যঙ্ক বংশ তাদের জীবন মরণ ভালো মন্দের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্রাট বিম্বিসারের পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তাদের দায়ভার গ্রহণ করবে, এটাই তাদের কাছে পরম সত্য পুত্র অজাতশত্রুকেও শিশুকাল থেকে সেভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছে নগরীর অন্য কারুর মধ্যে সেই গুণাবলীর চর্চা করার কথা অচিন্তনীয় আর হর্যঙ্ক বংশ বহির্ভূত কেউ মগধের সিংহাসনে আসীন, এ আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয় আর দুর্ভাগ্যবশত আমার পুত্রদের মধ্যে অজাতশত্রু ব্যতীত রাজোচিত গুণাবলী আর কারুর মধ্যেই নেই
- কিন্তু সে যদি পিতৃহন্তা হয়? – আর্তনাদ করে ওঠেন বিম্বিসার মহিষী প্রাসাদ অলিন্দে তাঁর আর্তনাদের প্রতিধ্বনি ওঠে - পিতৃহন্তা, পিতৃহন্তা
- শান্ত হও দেবী, এই অস্থিরতা কি মগধসম্রাজ্ঞীর উপযুক্ত? যদি তথাগতের তাই ইচ্ছা হয়, তাই হবে আমি তাঁর আজ্ঞাবহ মাত্র
আকুলভাবে উঠে দাঁড়ান চেল্লনাদেবী কোনোক্রমে বলেনকিন্তু মগধের অফুরন্ত রাজকোষ তার হাতে চলে যাওয়া কি যুক্তিসঙ্গত?
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকেন বিম্বিসার অলিন্দ ধরে পদচারণা করতে করতে বলেনমগধের রাজকোষের উপর আমার অধিকার সামান্যই মহাদেবী ঠিক তার প্রজার যতটুকু
- আর স্বোপার্জিত ধন? দুর্মূল্য রত্নরাজি?
এবার সশব্দে হাস্য করে ওঠেন বিম্বিসার তিনি বুঝতে পারেন চেল্লনা দেবী কী বোঝাতে চাইছেন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের দুর্মূল্য রত্নরাজি তাঁর আয়ত্তাধীন থাকলে হয়তো অজাতশত্রু সেগুলো করায়ত্ত না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করবে না কিন্তু প্রথমত, ধনরত্নে প্রবৃত্তি তাঁর আর নেই, আর দ্বিতীয়ত, তিনি, অমিতবিক্রম মগধসম্রাট, কিনা রত্নরাজির বিনিময়ে নিজের জীবিত থাকা নিশ্চিত করবেন সে যে বড়ো লজ্জার
- আমার নিজের বলে কোনো সম্পত্তি আর নেই মহাদেবী, সবই তথাগতর শুধু একটি মাত্র বস্তু এখনও আছে, যার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা আমার কর্তব্য অজাতশত্রুর কাছে সে বস্তুর কোনো মূল্য নেই আমি জানি, তবে মর্যাদাহানি করার জন্যই হয়তো সেটা করায়ত্ত করতে সে চাইবে
বিস্ময় ফুটে ওঠে চেল্লনা দেবীর আর্দ্র দুই চোখে পরমুহূর্তেই চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর খুব মৃদু স্বরে বলেনকোন স্থানে কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে সে সম্পদ?
- তোমার বিচক্ষণতার উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে দেবী, আর এই রাজগৃহ নগরীর প্রতিটি গিরি কন্দর, জলাশয়, প্রতিটি সরণি, সড়ক, উদ্যান তোমার পরিচিত তুমিই আমাকে নির্দেশ দাও

১৮৭২, রাজগীর
দুটি গুহা, একবারে বৈভারের পাদদেশে প্রাকৃতিক নয়, পাহাড় কেটে তৈরি পালিশ করা দেয়াল, গঠন বারাবার গুহার মতোই প্রায় ঢোকার মুখেই গুহার গায়ে গুপ্তলিপিতে খোদাই করা কথাগুলো পড়তে ঘণ্টাখানেক মাত্র সময় নিল আর্নল্ড তাতে বলা আছে ভৈরোদেব নামে এক জৈন সাধু এই গুহার ভিতর তীর্থঙ্করদের মূর্তি স্থাপন করেছেন কানিংহাম বেশ ধন্ধে পড়ে যান গুহার গায়ে জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি খোদাই করা আবার গুহার ভিতরে চারমুখো পাথরের পাটাতনের গায়ে রয়েছে বৌদ্ধদের ধর্মচক্র ঢোকার মুখে একটি অসমাপ্ত বিষ্ণুমূর্তিও চোখে পড়েছে তাঁর হয়তো বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সাধু বা শ্রমণরা এই গুহায় আশ্রয় নিয়েছে, জপতপ ক্রিয়াকর্ম করেছে
মশাল জ্বালিয়ে এবার গুহার একদম ভিতরে ঢোকেন তিনজনে পাগলাটে লোকটা দূর থেকে গুহাদুটো দেখিয়ে দিয়েই পালিয়েছে মশালের আলো বহু যুগের সঞ্চিত ধুলো, মাকড়সার জাল, আগাছার স্তূপ ভেদ করে এবার গুহার পেছনের দেয়ালে গিয়ে পড়ে পাথরের গায়ে আবছা একটা দরজার আভাস ফুটে ওঠে, যেন কখনও কোনো দরজা ছিল সেখানে, পরে কেউ সেটা চিরতরে বন্ধ করে দিলেও দরজার ছাপটা থেকে গেছে তার মাথায় আবার কিছু একটা লেখা মশালের আলো লেখাটার উপর ফেলেন কানিংহাম
- এটা তো কতকটা ব্রাহ্মী লিপির মতো দেখতে হলেও ব্রাহ্মী নয়আর্নল্ড বিড়বিড় করে - মাথায় কেমন ত্রিকোণ মাত্রা, যেন শাঁখের নকশা
- হ্যাঁ, ব্রাহ্মী থেকেই এসেছে এই লিপি, কবে বা কীভাবে সেটা জানা নেই একে বলে শঙ্খলিপি, এখনও পর্যন্ত কেউ পড়তে পারে বলে শুনিনি মিস্টার জেমস্ প্রিন্সেপ এই লিপির অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিলেন বছর চল্লিশ আগে
মশালের আলোয় আর্নল্ডের চোখে লোভ চকচক করে ওঠে নিজের মনেই বলেওই দরজার পিছনেই ধনরত্ন আছে নির্ঘাত

রাজগৃহ, খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২
ঘড়ঘড় শব্দে মস্ত পাথরের খণ্ডটা সঠিক স্থানে সরে গিয়ে ঠিক একটা দরজার মতোই কক্ষটি বন্ধ করে দিল মগধসম্রাট ও সম্রাজ্ঞী বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন গুহামুখে
- এ বিদ্যা আপনি আয়ত্ত করলেন কীভাবে শ্রমণ? – মগধনরেশ অবনতমস্তকে প্রশ্ন করেন
- ধ্বনিবিদ্যা শব্দ ক’টি সঠিকভাবে উচ্চারিত হলে তবেই একমাত্র যে শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হবে তা এই প্রস্তরখণ্ড সরাতে সক্ষম নচেৎ নয় আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হে হর্যঙ্কপ্রধান
- আপনার পরিচয়, শ্রমণ?
- আমি সামান্য বৌদ্ধ ভিক্ষু, মাতাও ভিক্ষুনী
চলেই যাচ্ছিলেন শ্রমণ হঠাৎ সম্রাট আকুলভাবে বলে উঠলেনআপনার মাতার নাম প্রকাশে কোনো বাধা আছে শ্রমণ?
- কিছুমাত্র নয়, তিনি বৈশালীকন্যা আম্রপালিধীর পায়ে এগিয়ে যেতে থাকেন শ্রমণ, রাজদম্পতি তখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে

১৮৭২, রাজগীর
কানিংহাম আর জোসেফ ফিরে গেলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে থেকে গেছে আর্নল্ড ওই দরজা ভেঙে দেখতেই হবে ভিতরে কী আছে প্রয়োজনে কামান দেগে দরজা ভাঙবে সে একা অবশ্য হবে না, তবে লোভী জমিদারের অভাব তো নেই কামান জোগাড় করাও কঠিন কিছু নয় এখন মতলবটা পাকা হওয়া দরকার

রাজগৃহ, ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ
পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন শীলভদ্র শুধু তাই নয়, সম্ভবত রাস্তাও হারিয়েছেন, সেটা অবশ্য শ্রমণের পক্ষে অসুবিধার কিছু নয়, কোথাও সামান্য বিশ্রাম নিয়েই আবার যাত্রা শুরু করবেন নালন্দা মহাবিহারের রাস্তা তাঁর সুপরিচিত, কিন্তু এই পথ ধরে আগে যাননি অচেনা রাস্তায় এসেই এই বিপত্তি মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য ধর্মপাল তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন শুনেছিলেন এই পথে দ্রুত পৌঁছানো যাবে, এখন সমস্যায় পড়েছেন রোদের তেজও খুব বেশি
সামনে গুহা আছে বোধ হচ্ছে, ওখানেই বিশ্রাম নেবেন মনস্থ করলেন শীলভদ্র
প্রাকৃতিক গুহা এ নয়, দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন কারুর পা পড়েনি ভিতরে আগাছা, জঞ্জালের স্তূপ তারই ভিতর এককোণে বসে পড়েন ক্লান্ত ভিক্ষুক, পরম শান্তিতে ও আনন্দে একান্তে বলে ওঠেন নমো বুদ্ধায় গুহার অভ্যন্তরে গমগম করে ওঠে তাঁর কণ্ঠস্বর
প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ঘড় করে আওয়াজ ওঠে উদ্বিগ্ন শীলভদ্রের বিস্মিত চোখের সামনে গুহার একেবারে পেছনের দেয়ালের একটি প্রস্তরখণ্ড সরে গিয়ে ক্ষুদ্র একটি কক্ষ দেখা যায় শ্রমণদের আবার ভয় কীসের, শীলভদ্র এগিয়ে যান সেই কক্ষের দিকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন কক্ষটি দেখে বোঝা যায় কেউ কখনও প্রবেশ করেনি এখানে ঠিক মাঝখানে একটি প্রস্তরবেদি, তার উপরে রাখা সম্ভবত একটি মুখবন্ধ কলসি অকস্মাৎ গুহার ছাদের কোনো ফোকর থেকে আলোর রশ্মি এসে পড়ে কলসির গায়ে ঝলমল করে ওঠে সোনার কলসিটি এগিয়ে গিয়ে পরম শ্রদ্ধায় দুই হাতে সেটি তুলে ধরেন শীলভদ্র এমনভাবে রাখা যখন, কোনো পবিত্র বস্তুই হবে নিশ্চয়ই মুখটি আঁটা, ফলে ভিতরে কিছু আছে কিনা বোঝা মুশকিল
শীলভদ্র কলসিটি যথাস্থানে নামিয়ে রেখে আবার কক্ষের বাইরে গিয়ে দাঁড়ান একই প্রক্রিয়ায় কি বন্ধ হবে পাথরের দরজাটা? দেখাই যাক আবার পরম ভালোবাসায় উচ্চারণ করেন - নমো বুদ্ধায় কক্ষের দরজা বন্ধ হয়ে গুহার দেয়ালের সঙ্গে মিশে যায় সামান্য আভাস থেকে যায় মাত্র এ যে অসামান্য কারিগরি বিদ্যা কিন্তু কীভাবে এই কক্ষের দরজা খোলে তার তো সূত্র রাখা প্রয়োজন, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সুযোগ্য মানুষ এই বিদ্যার চর্চা করতে চাইবে হয়তো চিন্তামগ্ন হন শীলভদ্র বিশ্রাম নেওয়া আর হয় না তাঁর
বেশ খানিকক্ষণ পর আনন্দিত চিত্তে গুহা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি ভারি চমৎকার একটি উপায় পেয়েছেন কয়েকশো বছর পূর্বে ব্রাহ্মী লিপি থেকে আরও একটি লিপির উদ্ভব ঘটেছে খুব বেশি প্রচলন নেই এই লিপির শঙ্খের মতো আকার বলে এর নাম শঙ্খলিপি নালন্দা পৌঁছিয়েই ভাস্কর ধর্মদত্তকে নিয়ে তিনি ফিরে আসবেন এই গুহায় কক্ষ খোলার সূত্রটি দরজার উপরে গুহাগাত্রে খোদাই করিয়ে রাখবেন শঙ্খলিপিতে মনের আনন্দে নালন্দা মহাবিহারের উদ্দেশে রওয়ানা দেন শীলভদ্র

১৮৭৩, রাজগীর
বিকট শব্দে গুহার দেয়ালে আছড়ে পড়ে কামানের গোলা
আর্নল্ড বেগলারের অনুমান অমূলক ছিল না একেবারেই খুব সহজেই স্থানীয় জমিদার হরিপ্রসাদ সিংকে দলে পেয়ে গিয়েছিল সে তারপর কামান জোগাড় করে কয়েকজন লোভী কিন্তু বিশ্বস্ত লোক জোগাড় করতে বেশি দিন লাগেনি
কালচে ছোপ পড়ে গুহার গায়ে, কিন্তু আর কিছুই হয় না
হরিপ্রসাদকে রীতিমতো বুদ্ধিমান বলতে হবে, চোখ মুখ কুঁচকে গুহার দেয়ালের দিকে দেখিয়ে বললওটা কী?
আর্নল্ড তাকায় সেদিকে কী যেন বলেছিলেন কানিংহাম? হ্যাঁ শঙ্খলিপি যত্ত সব বাজে ব্যাপার
দরজার আবছা রেখাটার দিকে দেখিয়ে আর্নল্ড বলেওটা দেখো, ওই দরজা ভাঙবই আমি
আবার গোলার ধাক্কা লাগে, আবার কালচে ছোপ পড়া ছাড়া কিচ্ছু হয় না
রাজগীরের সুবর্ণভাণ্ডার বা সোনভাণ্ডার গুহা তার গোপনকথা গোপনেই রেখে দেয়

হয়তো অন্তরাল থেকে স্মিত হাস্যে দেখতে থাকেন আচার্য শীলভদ্র, দেখতে থাকেন আশ্চর্য শব্দবিদ্যার অধিকারী সেই শ্রমণ, বা সেই পাগলাটে লোকটা যে এই গুহার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিল
লোভ দিয়ে কি আর পৃথিবীর সব দরজা খোলা যায়
----------
ছবি – শুভশ্রী দাস

No comments:

Post a Comment