
স্বপ্ন বুনন
সায়নদীপা পলমল
ছোট্ট একটা মিষ্টি রাজ্য চন্দ্রনগর। রাজা
চন্দ্রমৌলির অধীনে সকলে সুখে শান্তিতে বসবাস করে। চন্দ্রনগরের ঘরে ঘরে রয়েছে তাঁত, রাজ্যের প্রায়
প্রতিটি ঘরে কেউ না কেউ তাঁত বোনে। সেই তাঁতের কাপড়, তার
ওপর ফুটে ওঠা কারুকার্য এত সুন্দর হয় যে আশেপাশের বহু রাজ্যের মানুষ এই কাপড়ের
সন্ধানে ছুটে আসেন। রাজ্যের প্রতিটি ঘরে সমৃদ্ধির অভাব নেই। রাজা তাঁর নির্ধারিত
খাজনা ব্যতীত আর কোনো অর্থ দাবি করেন না, বরং প্রজাদের কোনো
অসুবিধার কথা শুনলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে যান।
রাজা চন্দ্রমৌলির একমাত্র পুত্র যুবরাজ চন্দ্রনাথ।
ছেলেবেলা থেকেই ভীষণ রকমের উচ্চাকাঙ্ক্ষী তিনি। বাইরের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে তাঁর
একথাই মনে হয়েছে যে আর্থিক দিক দিয়ে তার বাবা অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। প্রজাদের
সাহায্য করে করে নিজের দিকে তেমন নজরই দেননি তিনি। প্রতিবেশী রাজ্যের রাজকুমারদের
সঙ্গে চন্দ্রনাথের সখ্যতা রয়েছে কিন্তু সেই সকল রাজকুমারদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা
করলে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র মনে হয় তার। এই নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও বিশেষ
লাভ হয়নি। রাজা চন্দ্রমৌলি বলেছেন, “সংকীর্ণ মন নিয়ে সুস্বপ্ন দেখা যায় না।”
কালক্রমে বৃদ্ধ রাজা চন্দ্রমৌলি অসুস্থ হয়ে
দেহত্যাগ করলেন। নতুন রাজা হলেন চন্দ্রনাথ। রাজা হয়েই তিনি নিজের মতো করে একাধিক
নতুন নিয়ম জারি করলেন। যার প্রথম নিয়মই হল রাজ্যের প্রত্যেকটি পরিবারের
প্রত্যেকটি সদস্যকে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁত বুনতে হবে। এই তাঁতের বস্ত্র রাজার লোক
সংগ্রহ করে আনবে, তারপর বিক্রয় করে যা অর্থ পাওয়া যাবে তার অর্ধেক থাকবে রাজার কাছে আর
বাকি অর্ধেক তাঁতি পরিবার পাবে। চন্দ্রনাথ জানতেন তাঁর রাজ্যের তাঁতের চাহিদা
রয়েছে চারিদিকে, তাই তাঁতের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলে রাজকোষ
অল্পদিনেই ফুলে ফেঁপে উঠবে। জমিতে চাষ করা সহ বাকি প্রয়োজনীয় কাজের ভার
নির্দিষ্ট কিছু লোকের মধ্যে ভাগ করে দিলেন তিনি। এর ফলে আগে যে পরিমাণ জমিতে
পাঁচজন কাজ করত এখন সেখানে একজনের ওপরেই সব দায়িত্ব এসে চাপল। বাকি ক্ষেত্রেও একই
অবস্থা।
চন্দ্রনগরের প্রান্তে জঙ্গলের ধারে ছোট্ট কুটির বেঁধে
বাস করে নীনা। চৌদ্দ বছর বয়সি নীনার এক সময় সব ছিল - পরিবার ছিল, নগরের মাঝে ঘর
ছিল, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। কিন্তু তারপর একে একে সব হারিয়ে
যায়। প্রথমে এক অজানা জ্বরে নীনার মা-বাবা চলে যায়। তারপর বছর দুয়েক আগে চলে
যায় তার বৃদ্ধা ঠাকুমা। সেই থেকে নীনার ঠাঁই হয়েছে এই জঙ্গলের ধারে। নীনার
ঠাকুমা এক সময় এই নগরীর সেরা তন্তুবায় ছিলেন, কিন্তু
দুর্ভাগ্যবশত নীনা কিছুতেই ওনার কাছে তাঁত চালানোটা শিখে উঠতে পারেনি। এদিকে রাজার
নির্দেশ এই রাজ্যে থেকে তাঁত না চালাতে পারলে তাকে রাজ্য ছাড়া হতে হবে। নীনাকেও
তাই হতে হয়েছে। এখন জঙ্গলের গাছ আর পশুরাই তার পরিবার, তার
আশ্রয়দাতা।
একদিন জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে ফেরার পথে নীনার দেখা
হয়ে গেল পরান তাঁতির সঙ্গে। নগরে থাকার সময় পরান তাঁতির পরিবারের সঙ্গে নীনাদের
ভালো আলাপ ছিল। আজ এতদিন পর পরানকে দেখে আঁতকে উঠল নীনা।
“তোমার এ কী অবস্থা হয়েছে পরান কাকা?” না বলে থাকতে
পারল না সে। দেখল পরান তাঁতির শরীরটা কঙ্কালের মতো হয়ে গিয়েছে, চোখের তলায় জমেছে পুরু কালি, হাতের তালু দুটোতে আর
চামড়া অবশিষ্ট নেই, ঘা হয়ে গিয়েছে।
নীনাকে দেখে পরান তাঁতি একটা মলিন হাসি হেসে বলল, “তুই তো শুধু আমাকে
দেখছিস রে, এই একই অবস্থা তো গোটা রাজ্যের।”
“সে কী! কেন?” জানতে চাইল নীনা।
পরান তাঁতি বলল, “এই অত্যাচারী রাজার শাসনে কেউ কি ভালো
থাকতে পারে? রাজার লোভের মাশুল গুনতে হচ্ছে আমাদের। শুধু
তাঁত বোনা নয়, যে যেই কাজই করুক না কেন তাকে আগের তুলনায়
তিনগুণ বেশি খাটতে হচ্ছে। এদিকে পরিশ্রমের ফল বেশীরভাগটাই নিয়ে নিচ্ছে রাজা। সেই
সঙ্গে রাজার কর্মচারীদের জুলুমের জ্বালায় আরও অস্থির অবস্থা। বিভিন্ন রকমের
প্রলোভন দেখিয়ে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারাও অসৎ উপায়ে অর্থ
আদায় করছে আমাদের থেকে। আমরা সব বুঝেও সুদিনের আশায় বারবার ভুল করে ওদের বিশ্বাস
করে ফেলছি। ফলস্বরূপ ঠিকমতো খাবার অবধি জুটছে না আমাদের। কাজ করার মতো বল পাচ্ছি
না। শরীরে ক্লান্তি থাকছে কিন্তু পেটের জ্বালায় রাতে ঘুম হচ্ছে না। ঘুম না হলে
আমরা স্বপ্নও দেখতে পারছি না। তুই তো জানিস স্বপ্নই আমাদেরকে কাপড়ে নতুন নতুন নকশা
তোলার খোরাক জোগাত এতদিন। এখন স্বপ্ন না দেখার ফলে কাপড়ের সব নকশা একঘেঁয়ে হয়ে
যাচ্ছে, লোকজন আর আমাদের কাজ পছন্দ করছে না। এদিকে বিক্রি
কমে যাওয়ায় রাজার অত্যাচার বেড়েই চলেছে। আমরা ভালো নেই রে মা, আমরা ভালো নেই।”
পরান তাঁতির কথা শুনতে শুনতে হতবাক হয়ে যাচ্ছিল
নীনা। শেষ কথাগুলো বলতে বলতে যখন পরান তাঁতির চোখে জল চলে এল তখন নীনা অবাক গলায়
বলল, “তোমরা কেউ প্রতিবাদ করছ না কেন?”
পরান তাঁতি বলল, “কে করবে রে মা? দাশরথি
প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল, তাকে সেই যে রাজার লোকেরা তুলে
নিয়ে গেল, আজ অবধি আর তার হদিশ নেই।”
“সে কী!”
একলা এই কুটিরে থাকলেও নীনা রোজ রাতে শান্তিতে
ঘুমোতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে নিশ্চিন্তে। প্রায়দিন সে স্বপ্ন দেখে এক আশ্চর্য মায়া
গাছের সামনে বসে রয়েছে। চাঁদের আলো সরাসরি সেই গাছের ওপর নেমে উজ্জ্বল সোনালি
সুতো তৈরি করে দিচ্ছে আর সেই সুতো দিয়ে কাপড় বুনছে নীনা। এই স্বপ্নের অর্থ কী সে
আজ অবধি বোঝেনি, স্বপ্ন সবসময় যে সত্যি হয় তেমনও তো নয়,
তবে স্বপ্নটা দেখতে তার ভালোই লাগে। আজ রাতে নীনার দুই চোখে কিছুতেই
ঘুম আসছিল না। বারবার পরান তাঁতির বলা কথাগুলো কানে বাজছিল তার – “আমরা ভালো নেই
রে মা, আমরা ভালো নেই”। অস্থির নীনা উঠে বসে
পড়ল। তাকিয়ে দেখল পূর্ণিমার চাঁদ তার কুটিরের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। নীনার
যখনই খুব মনখারাপ লাগে তখনই সে তার ঠাকুমার রেখে যাওয়া লোহার সিন্দুকটা খুলে
ভেতরের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে। আজ এই প্রথমবার রাতের বেলা চাঁদের আলোয় সিন্দুকটা
খুলল সে। সিন্দুকে ঠাকুমার ব্যবহার করা জিনিসের সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোট্ট তাঁতও
রয়েছে। ঠাকুমা বেঁচে থাকতে নীনা কোনোদিন এই তাঁত দেখেনি, দেখলে জানতে চাইত
এত ছোটো তাঁত দিয়ে কী হয়। আজকে তাঁতটা বের করে তার গায়ে একবার হাত বোলাল নীনা,
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরটা কেমন কাঁটা দিয়ে উঠল। চমকে গেল সে,
এমনটা তো আগে কখনও হয়নি। ভয়ে ভয়ে আরও একবার তাঁতটার গায়ে হাত
ছোঁয়াল সে, এবার আর সেরকম কিছু বুঝতে পারল না। হঠাৎ কী মনে
হতে ঠাকুমার মতো করে তাঁতটায় টান দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁতের ওপর কিছু ছবি নকশার
মতো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। আতঙ্কে প্রথমে ছিটকে গেল নীনা, তারপর
একটু সাহস সঞ্চয় করে আবার হামাগুড়ি দিয়ে তাঁতটার কাছে গেল সে। আবারও টান দিল
সাবধানে। জানালা দিয়ে গলে আসা চাঁদের আলো এবার সোজাসুজি এসে পড়ল তাঁতের গায়ে আর
সেখানে ফুটে উঠল এক মায়াবী মানচিত্র। হতবাক হয়ে নীনা দেখল এ মানচিত্রে তাদের
জঙ্গলটা ফুটে উঠেছে, কিন্তু আসলে এ কোথায় যেতে নির্দেশ
দিচ্ছে!
“এত কী ভাবছ? এতদিন পর যখন আসল জিনিসের হদিস পেলে তখনও
ঘরে বসে থাকবে?”
আচমকা একটা অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল নীনা, ভয়ার্ত গলায়
জানতে চাইল, “কে?”
“আমি গো আমি।”
নীনা অবাক হয়ে দেখল তার সামনে একটা জোনাকি ডানা
মেলে উড়ছে। জোনাকি বলল,
“আমি রোজ অপেক্ষা করতাম কবে তুমি তোমার গুপ্তধনের সন্ধান পাবে। আজ
অবশেষে সেই দিন এল।”
“গুপ্তধন!”
“হ্যাঁ গো হ্যাঁ, এই মানচিত্রের নির্দেশ মেনে
বেরিয়ে পড়ো। তুমি যদি এই গুপ্তধনকে উদ্ধার করতে পারো তাহলে একদিকে যেমন
তোমার ভাগ্য ফিরে যাবে,
তেমনই এই রাজ্যেও সুদিন ফিরে আসবে।”
“তাই নাকি!”
ধনদৌলতের লোভ নীনার কোনোদিনই ছিল না, কিন্তু রাজ্যের
সুদিন ফেরার আশায় সে তাঁত হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। জোনাকি চলল তার আগে আগে। নীনা
যত এগোচ্ছিল ততই মানচিত্রে তার সামনে থাকা পথ আলোকিত হয়ে উঠছিল। হাঁটতে হাঁটতে
অবশেষে নীনা একটা প্রকাণ্ড গাছের সামনে এসে দাঁড়াল। গাছটা দেখেই চমকে গেল সে,
এ তো তার স্বপ্নে দেখা সেই গাছ!
জোনাকি বলল, “অবাক হলে! এতদিন ধরে তোমার স্বপ্নে তোমার
ঠাকুমা কত ইঙ্গিত দিয়েছেন কিন্তু তুমি বুঝতে পারনি।”
“কীসের ইঙ্গিত? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!” বলল নীনা।
জোনাকি বলল, “এই গাছ কোনো সাধারণ গাছ নয়। এ হল অটবী
মা। এই জঙ্গলের, এই রাজ্যের ধাত্রী। একটা সময় ছিল যখন
রাজ্যবাসী নিয়মিত এসে অটবী মায়ের আরাধনা করত। তাই অটবী মা খুশি হয়ে এই জঙ্গলের
গাছের আঁশ থেকে তাদের সুতো তৈরি করার কৌশল শেখাল, শেখাল
বস্ত্র বুননের কৌশল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন অন্য উপায়ে সুতোর জোগান
পাওয়া যেতে লাগল তখন মানুষ এই জঙ্গল আর অটবী মাকে ভুলে গেল। অটবী মা রোজ অপেক্ষা
করতেন কিন্তু একজন বাদে কেউ আসত না।”
“সেই একজন কে?”
“সেই একজন ছিল তোমার পূর্বপুরুষ। অটবী মায়ের প্রতি
তার শ্রদ্ধা চিরকাল একই রকম ছিল। তাই অটবী মা খুশি হয়ে তাকে এই তাঁতটি উপহার দেন।
বলেন বংশ পরম্পরায় তোমাদের পরিবারের কেউ না কেউ এক গুপ্ত ক্ষমতা পাবে, যার সাহায্যে সে
স্বপ্নকে বুনতে পারবে কাপড়ে। সেই কাপড়ের মায়া ক্ষমতায় সমস্ত খারাপও ভালো হয়ে
যাবে।”
“সত্যিই?” অবাক গলায় জানতে চাইল নীনা।
জোনাকি বলল, “একদম সত্যি। কিন্তু শর্ত একটাই।”
“কী?”
“তোমাকে আগে নিজের ওপর বিশ্বাস আনতে হবে। অটবী
মায়ের ওপর বিশ্বাস আনতে হবে। তবেই অটবী মা জেগে উঠে তোমাকে সাহায্য করবেন।”
“কিন্তু আমি তো কাপড় বুনতে পারি না।”
“পারবে, মনে জোর আর বিশ্বাস আনো। নিজেকে অটবী
মায়ের কাছে সমর্পণ করে দাও। তোমার মনের মধ্যে যে অবিশ্বাস আর সন্দেহের শক্তি
রয়েছে তাদের বের করে দাও।”
জোনাকির কথা শুনে মনে দ্বিধা নিয়ে চোখ বন্ধ করল
নীনা। বিড়বিড় করে বলল,
“আমার সহায় হও অটবী মা।”
কিচ্ছু হল না। দ্বিতীয়বার একই শব্দ উচ্চারণ করল
সে। এবারেও ব্যর্থ হল। চোখ খুলে ফেলল নীনা, “কিচ্ছু হচ্ছে না।”
“তুমি কি বিশ্বাস এনেছ মনে? বিশ্বাস করেছ
তুমি পারবে?”
জবাব দিতে পারল না নীনা, সে তো শুধু ডাকার
জন্য ডেকেছিল অটবী মাকে। এবারে আরও একবার চোখ বন্ধ করল সে। মনে মনে স্বপ্নের
দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার মনের ভেতর থেকে কারা যেন বলে
উঠল – ‘এ সবই মায়া, একে বিশ্বাস করিস না। তুই তো বুনতেই
পারিস না, তুই এই ক্ষমতার উত্তরাধিকারী কেমন করে হবি! তোর
নিজের ভাগ্য কোনোদিন সহায় হয়নি আর তুই রাজ্যের ভাগ্য পালটাবি?’
কথাগুলো নীনার কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, কান থেকে ক্রমশ
মাথায় ছড়িয়ে পড়ল। ছটফট করতে লাগল নীনা। বন্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বারবার
ব্যর্থ হওয়ার ছবিগুলো। নীনার দম আটকে আসতে লাগল। সে মরিয়া হয়ে চোখ খুলে ফেলে
পালিয়ে যাবে ভাবল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঠাকুমার মুখটা
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে পড়ে গেল ঠাকুমা তাকে বলতেন, “মন খারাপ করিস না নীনা, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ। এই
প্রকৃতি কাউকে খালি হাতে পাঠান না, তোর ভেতরেও নিশ্চয় গুপ্ত
ধন লুকিয়ে আছে। শুধু তাকে খুঁজে বের করার অপেক্ষা।”
কথাটা মনে পড়তেই চমকে উঠল নীনা। ঠাকুমাও তাকে
গুপ্ত ধনের কথা বলত। এই জোনাকির গুপ্তধন মানে তার নিজের ভেতরে থাকা ধন, তার নিজের শক্তি!
প্রকৃতি কাউকে খালি হাতে পাঠান না। সত্যিই তো! আজ পরান তাঁতির সঙ্গে দেখা, চাঁদের আলোয় প্রথমবারের জন্য এই তাঁতের রহস্য আবিষ্কার করা - এ তো নিছক
কাকতালীয় হতে পারে না। তাছাড়া আজ যদি নীনা রাজ্যের ভেতরে থাকত তাহলে তার অবস্থাও
তো বাকিদের মতোই হত, সেও তখন স্বপ্ন দেখতে ভুলে যেত। আজ সে
রাজ্যের বাইরে বলেই এতদিন ধরে স্বপ্ন দেখেছে, স্বপ্নে অটবী
মাকে পেয়েছে। তার মানে নীনা সত্যিই গুপ্ত ধনের অধিকারী। সে স্বপ্নে দেখত অটবী
মায়ের সামনে বসে সে তাঁত বুনছে। তার মানে অটবী মায়ের আশীর্বাদে সে সত্যিই পারবে।
নিশ্চয় পারবে।
“মা, আমার সহায় হও মা। আমাকে দিশা দেখাও।”
এইবার অন্তর থেকে অটবী মাকে ডাকল নীনা। সঙ্গে সঙ্গে
তার মনে হল তার চোখের সামনে এক উজ্জ্বল আলোকে ছেয়ে গিয়েছে। সে ধীরে ধীরে তার দুই
চোখের পাতা উন্মুক্ত করল। অবাক হয়ে দেখল হুবহু তার স্বপ্নের মতো করে চাঁদের আলো
উজ্জ্বল হয়ে এসে পড়ছে অটবী মায়ের শরীরে। অটবী মা তার ডালপালাকে হাতের মতো ব্যবহার
করে নিজের শরীর থেকে সোনালি আলোর সুতো বের করে চলেছে। নীনা পরম শ্রদ্ধায় হাত
বাড়িয়ে সেই সুতো নিয়ে লাগাল তার ছোট্ট তাঁতে। তারপর টান দিল। মুহূর্তের মধ্যে
তাঁত শব্দ করে চলা শুরু করল। যে নীনা আগে কোনোদিন তাঁত চালাতে পারেনি আজ সে ভোর
হওয়ার আগে অবধি নিরলসভাবে তাঁত বুনে গেল। ভোরের আলো যখন ফুটল ততক্ষণে নীনার হাতে
এক চমৎকার সোনালি কাপড়,
যার ওপরে তুলে ধরা এক প্রজাবৎসল রাজার ছবি। যে রাজাকে পাওয়ার
স্বপ্নে গোটা চন্দ্রনগর বিভোর, সেই স্বপ্ন বুনে ফেলেছে নীনা
স্বয়ং।
রাজা সচরাচর কোনো প্রজার সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন
না। কিন্তু প্রহরীকে নীনা নিজের হাতের কাপড়টা দেখাতে প্রহরীর ভেতর অটবী মায়ের
মায়া খেলে গেল, সে বিনা বাধায় নীনাকে ভেতরে যেতে দিল। একটা অচেনা মেয়েকে রাজসভায় দেখে
রাজা রেগে উঠতে যাচ্ছিলেন কিন্তু নীনার হাতের ওই অপূর্ব কাপড়টা দেখে আর পারলেন
না। এমন আশ্চর্য রকমের সুন্দর কাপড় তিনি এর আগে কোনোদিন দেখেছেন কিনা মনে করতে
পারলেন না। রাজাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাপড়টার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনে সাহস
পেল নীনা। অটবী মাকে স্মরণ করে সে বিনীত কণ্ঠে বলল, “আপনার
জন্য এই উত্তরীয় উপহার এনেছি মহারাজ। অনুগ্রহ করে এই উপহার গ্রহণ করুন।”
মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাজা নীনার হাত থেকে কাপড়টি
নিয়ে নিজের গায়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাপড়টি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল। সেই আলোকের
ঔজ্জ্বল্য সহ্য করতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেললেন রাজা চন্দ্রনাথ।
তাঁর বন্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠল এক কঙ্কালসার তাঁতির ছবি। তিনি দেখতে পেলেন এক
বৃদ্ধা চোখে কম দেখার কারণে হাত কেটে ফেলছেন বারবার, কিন্তু রক্তাক্ত হাতেই তাঁত বুনে
চলেছেন তিনি, কে যেন তাকে বলছে, “তাঁত
না বুনতে পারলে এ রাজ্যে কোনো ঠাঁই নেই তোমার।” চমকে উঠলেন রাজা
চন্দ্রনাথ, বৃদ্ধার রক্তাক্ত আঙুলের যন্ত্রণা যেন সঞ্চারিত হল তাঁর আঙুলেও। শিউরে
উঠলেন তিনি। তারপর দেখতে পেলেন একজন চাষি এক নাগাড়ে সারাদিন লাঙল করে যাচ্ছে।
তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও থামতে পারছেন না তিনি। চাষির তৃষ্ণা অনুভূত হল
রাজার ওষ্ঠে। তিনি কাতরভাবে চাইলেন চাষি একটু থামুক, একটু
জিরিয়ে নিক। চাষির লাঙল থমকে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চাষির পিঠে এসে পড়ল
চাবুকের আঘাত। কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল, “সামান্য চাষির এত
বড়ো আস্পর্ধা যে কাজ শেষ হওয়ার আগে অসময়ে বিশ্রাম নেয়!” আবারও চাষির পিঠে নেমে
এল চাবুকের আঘাত। যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলেন রাজা চন্দ্রনাথ। এরপর তাঁর সামনে একের
পর এক আরও দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল, বলা ভালো রাজা নিজেকে সেই
সমস্ত দৃশ্যে খুঁজে পেতে লাগলেন। প্রজাদের দুঃখ, যন্ত্রণা
প্রতি মুহূর্তে ছুঁয়ে যেতে লাগল তাঁকেও। বাস্তব ভুলে তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
“থামো... থামো... আর সহ্য করতে পারছি না আমি। থামো... ওদের ওপর আর
অত্যাচার কোরো না।”
সভায় উপস্থিত পারিষদগণ রাজার এই অবস্থা দেখে
পরস্পরের মুখের দিকে চাইতে লাগলেন। রাজামশাই কেন চিৎকার করছেন, কীসের এত কষ্ট
তাঁর কিছুই বুঝতে পারলেন না তারা। নীনাও যে সবটা বুঝতে পারছিল তা নয়, তবে সে অনুমান করতে পারছিল যে এ হচ্ছে অটবী মায়ের স্বপ্নের মায়া। তিনি
নিশ্চয় রাজামশাইকে কোনো স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
আর এদিকে প্রজাদের যন্ত্রণা নিজের মধ্যে উপলব্ধি
করতে করতে যেই মুহূর্তে রাজার দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এল ঠিক সেই মুহূর্তে
তাঁর বুকের মধ্য থেকে একটা কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল বাইরে।
লোভ আর অহংকার মেশানো সেই বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ধীরে ধীরে রাজার শরীর থেকে নির্গত
হয়ে মিশে যেতে লাগল শূন্যে।
* * *
এরপর থেকে রাজা চন্দ্রনাথ পুরোপুরি পালটে গেলেন।
তাঁর শরীর থেকে লোভ আর অহংকারের বিষ নির্গত হয়ে যেতেই তিনি তাঁর পিতার থেকেও অধিক
প্রজাবৎসল হয়ে উঠলেন। প্রজাদের সুখ দুঃখের খেয়াল রাখাই তাঁর জীবনের ধর্ম হয়ে
উঠল। আর তাঁর রাজপরিচ্ছদের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠল নীনার উপহার দেওয়া
উত্তরীয়টি। এখন আর এই মায়া উত্তরীয়র ঔজ্জ্বল্যে রাজাকে চোখ বন্ধ করতে হত না, এই ঔজ্জ্বল্য
তিনি দুই চোখ ভরে এখন গ্রহণ করতে পারতেন আর এই দীপ্তিতেই তিনি তাঁর রাজ্য শাসন
করতে লাগলেন।
অন্যদিকে নীনাও অচিরেই হয়ে উঠল তার ঠাকুমার মতো
রাজ্যের সেরা তন্তুবায়। শুধু তাই নয়, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদেরও সে স্বপ্ন বোনা
শেখাত। শেখাত কেমন করে নিজের ওপর বিশ্বাসটাই হয়ে উঠতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড়ো
গুপ্তধন।
----------
ছবি - সুকান্ত মণ্ডল
No comments:
Post a Comment