
বুলবুলিতে ধান
খেয়েছে
দেবব্রত দাশ
এক
সকাল ন’টার
মধ্যে ব্রেকফাস্ট-এর পাট চুকিয়ে
দক্ষিণ-পুবের অলিন্দে এসে আরামকেদারায়
গা এলিয়ে দিলেন অম্বরীশ। আজ রোববার। প্রাণভরে
আয়েশ করবেন। সপ্তাহের
একমাত্র এই দিনটিতে তিনি প্রাতর্ভ্রমণে বেরোন না, বলেন - সব কাজেই একটা ছুটির দিন থাকে, থাকা উচিত। হাঁটাও
একটা কাজ।
কল্যাণী
অবশ্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রোজ আবাসনের ভিতরের রাস্তায় হাঁটতে বেরোন। আজও ব্যতিক্রম হয়নি, বেরিয়েছিলেন অন্যান্য দিনের মতোই। ভালো করে রোদ্দুর উঠবার আগেই ঘরে ফিরে
এসেছেন, যেমন ফেরেন তিনি নিত্যদিন।
কিছুক্ষণের
মধ্যেই পাপাই-মুন্নি দু’টিতেই এসে হাজির। দুজনের হাতেই একটা
করে বেতের মোড়া।
পিঠোপিঠি
ভাইবোন ওরা। পাপাই ১১
আর মুন্নি সবে ৯ পার হয়েছে। একমাসও হয়নি, গত ফাল্গুনের ১৪ তারিখে মুন্নির নবম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ধুমধাম করে পালিত
হল। সেই
আনন্দের দিনেও মুন্নির আপশোশের সীমা পরিসীমা ছিল না... কী? না - বয়েসের দিক দিয়ে কখনোই সে টপকে যেতে পারবে না দাদাকে।
নবীনতম
প্রজন্মের এই দুই খুদে যেমন চঞ্চল, তেমনই দুষ্টু। নিজেদের
মধ্যে খুনসুটি আর মারামারি চলতেই থাকে রাতদিন যখন তখন, বিশেষ করে ছুটির দিন হলে একেবারে লাগামছাড়া। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয়
ইশকুলের পড়ার চাপে ওরা এতটাই কাবু হয়ে থাকে যে অন্যদিকে মন দেওয়ার সময়ই পায় না।
আজ রোববারের
এই ছুটির দিনে দু’টিতে জমিয়ে ব্রেকফাস্ট করেছে ওদের ঠাকুরদা আর ঠাকুমার সঙ্গে। ঠাকুরদা অম্বরীশ চাকলাদার ৬
বছর আগে অবসর নিয়েছেন। চাকরি-জীবনে ছিলেন নামকরা কোম্পানির জাঁদরেল
অফিসার। গম্ভীর এবং
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ। অধস্তন কর্মচারীবৃন্দ সমঝে চলত তাঁকে। বলতে গেলে চাকরি-জীবনের শুরু থেকে শেষদিন পর্যন্ত পুরো সময়টাতেই অন্যায়ের
সঙ্গে আপস করেননি কখনও, যা কিনা এযুগে দুর্লভ। কিন্তু বাইরের আবরণের আড়ালে ভিতরে ভিতরে অম্বরীশ দয়াশীল
কোমলপ্রাণ মানুষ। অবসর
নেওয়ার পর হঠাৎ করে ভারমুক্ত হয়ে অনভ্যস্ত জীবনের শুরুতে তিনি কিঞ্চিৎ বিড়ম্বনার
সম্মুখীন হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই আঁকড়ে ধরেছেন নাতি-নাতনিকে। পাপাই আর মুন্নিও ওদের ঠাকুরদাকে নতুন রূপে চেনার সুযোগ
পেয়ে এখন একেবারে তাঁর নেওটা। ঠাকুমা কল্যাণী অতিশয় স্নেহশীলা মহিলা। নিত্যদিন সংসার সামলাতে গিয়ে
সকালের দিকে একেবারেই সময় পান না। তাঁর বউমা তিয়াশা স্কুলের শিক্ষিকা হওয়ায় ঘর-গেরস্থালির কাজ করতে গিয়ে যাতে নাকানিচোবানি না খায়, সেদিকে তাঁর সদা সতর্ক দৃষ্টি। ছুটির দিনের দুপুরের আর রোজ রাত্তিরের
অনেকটা সময় কল্যাণীর কাটে নাতি-নাতনিদের
সান্নিধ্যে।
মোড়া পেতে
জাঁকিয়ে বসে মুন্নি বলে ওঠে, “দাদান আজকের আড্ডায় আমাদের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা করবে, ভেবেছ কিছু?”
“আড্ডা!” চমকে উঠেই মৃদু হেসে জবাব দেন
অম্বরীশ, “হ্যাঁ, ভুল কিছু বলিসনি রে মুন্নি! যদিও আড্ডা হয় সমবয়সিদের মধ্যে, তবে এক অর্থে বুড়ো বয়েসে পৌঁছে আমি আর তোদের ঠাম্মু আবার
ছেলেমানুষ হয়ে গেছি বলতে পারিস।”
“তা - তোমার কি মনে আছে দাদান, গত রোববার কী নিয়ে আলোচনা করেছিলে?” জিজ্ঞেস করে পাপাই।
“কী নিয়ে বল তো?” জবাবে বলেন অম্বরীশ, “ঠিক মনে করতে...”
“আমার মনে আছে,” অম্বরীশকে থামিয়ে
দিয়ে মুন্নি বলে ওঠে, “জঙ্গল নিয়ে বলেছিলে... বলেছিলে গাছপালা নিয়ে... আর হ্যাঁ, একথাও বলেছিলে - নগরের উন্নতি করতে গিয়ে বা নতুন নতুন শহর বানাতে গিয়ে যেভাবে গাছ কেটে ফেলা
হচ্ছে, তাতে পৃথিবীর জীবজগৎ ধ্বংস হয়ে
যাবার মুখে, যদি আমরা এখনই অনেক অনেক গাছ না
লাগাই।”
“বাহ্ মুন্নি! বেশ মনে রেখেছিস তো!” উচ্ছ্বসিত অম্বরীশ নাতনির গাল টিপে দেন আদর করে, “কিন্তু কেন আমরা সব্বাই ধ্বংস হয়ে যাব, সেটা বলতে পারবি তো?”
“হ্যাঁ, ওই যে... কী যেন...” মুন্নি আমতা আমতা করছে দেখে পাপাই জবাব দেয়, “আমি বলতে পারি দাদান, একদম সহজ ব্যাপার। গাছ সঠিক পরিমাণ অক্সিজেন সাপ্লাই না
দিলে এমন সময় আসবে, যখন এত এত মানুষ আর
জীবজন্তু শ্বাস নিতে গিয়ে অক্সিজেন না-পেয়ে মরে যাবে।”
“শাবাশ পাপাই,” বলে ওঠেন অম্বরীশ, “এই না হলে আমার নাতি তুই!”
“আমারও মনে পড়ে গিয়েছিল, দাদাটা কেমন যেন... আমাকে বলতেই দিল না!”
অম্বরীশ হাত
বাড়িয়ে মুন্নিকে কাছে টেনে এনে আদর করেন, “জানি তো - আমার নাতি, নাতনি - দুজনেই কিছু শিখলে ভোলে না।”
“এবার বলো দাদান - আজ কোন বিষয় নিয়ে
বলবে।” অধৈর্য পাপাই অম্বরীশের চোখে চোখ রাখে।
“বলছি,” বলে চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবতে
ভাবতে হঠাৎ চোখ খুলে পাপাইয়ের দিকে চেয়ে অম্বরীশ জিজ্ঞেস করেন, “কোন পাখির ডাক শুনছিস এখন বল তো? এই যে এখন মিষ্টি সুরে ডাকছে - শুনতে পাচ্ছিস?”
কান খাড়া
করে শুনেও খুদে দুজন নির্বাক।
“অপশন দিচ্ছি তিনটে,” অম্বরীশ বলেন, “দোয়েল, বুলবুল আর ‘বসন্ত বাউরি’।”
“কঠিন প্রশ্ন,” মন্তব্য করেই বলেন
অম্বরীশ, “বলেই দিচ্ছি। এখন যে পাখির ডাক শুনছিস, তার নাম ‘বসন্ত বাউরি’। আর নাম শুনেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস যে
বসন্ত কালের পাখি। এখন
চৈত্রমাসের শুরু মানে ভরা বসন্ত। ‘বসন্ত বাউরি’-কে দেখতে পাওয়া যায় মার্চ থেকে জুন।”
“তুমি এত সব জানলে কেমন করে দাদান?” অবাক হয়ে অম্বরীশের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় পাপাই।
“কী জানিস দাদুভাই, একেবারে ছেলেবেলা
থেকেই পাখি-সম্পর্কে ভীষণ কৌতূহল ছিল আমার। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ
আরও বেড়ে গেল। ‘বার্ড ওয়াচার’ মানে পাখি দেখা যাদের নেশা, তাদের অভিজ্ঞতা-লব্ধ তথ্য নিয়ে লেখা নানান বই পড়ে পক্ষী-বিশারদ হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম একসময়। তারপর কাজের চাপে শখ মেটাতে পারিনি, রিটায়ারমেন্টের পর আবার ঢুকেছি ওই জগতে।”
“আচ্ছা দাদান, একটা কথা আমাকে বলো
তো তুমি... দিনকয়েক আগে আমাদের ক্লাসের দু-তিনজন ছেলে বলছিল - চড়াই নাকি আর দেখাই যায় না, সত্যিই যে তা নয়, আমি দেখেছি আমাদের আবাসনের কার্নিশে - বলা সত্ত্বেও মানতে চাইল না ওরা।”
“তোদের ক্লাসের ওই ছেলেরা ভুল কিছু বলেনি রে পাপাই,” বলেন অম্বরীশ, “তুই যে দেখেছিস, সেটাও ঠিক। কিন্তু চড়াইয়ের সংখ্যা সত্যিই অনেকটাই কমে গিয়েছে, কারণ কিছু বলছিল কি ওরা?”
“না দাদান, তা বলেনি।” জবাব দিয়েই পালটা প্রশ্ন করল
পাপাই, “কেন চড়াইয়ের সংখ্যা কমে গেল? এর পেছনে কোনো কারণ আছে নাকি?”
“আছে তো বটেই, শুনতে চাস?”
“হ্যাঁ দাদান, আমি শুনতে চাই,” মুন্নির কণ্ঠে অভিমান, “তুমি আমাকে পাত্তাই দিচ্ছ না একদম, দাদাকেই শুধু বলছ... যেন আমি নেই এখানে!”
“ওরে আমার অভিমানিনী ছোট্ট রাজকন্যে -” বলেই অম্বরীশ আবার মুন্নির গাল টিপে দিলেন, “শোন দিদিভাই, মন দিয়ে শোন। শুধু চড়াই
পাখিই নয়, আরও অনেক অনেক পাখি - বিশেষ করে ছোটো ছোটো পাখি, যেমন - বুলবুল, টুনটুনি, মৌটুসি এমনকি শালিক আর পায়রার সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হল - মোবাইল টাওয়ার থেকে নিঃসরিত তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ।”
“তাই!” দুই খুদেই বলে ওঠে একসঙ্গে।
“একদম তাই,” অম্বরীশ বলে চলেন, “অবশ্য, এটাও ঠিক যে, এই প্রতিকূল
পরিস্থিতিতেও অ্যাডাপ্টেশন বা অভিযোজন ক্ষমতার দরুন বিপদ কাটিয়ে বেঁচেও থাকছে ওদের
অংশবিশেষ। আর
সেজন্যেই এখন আবার দেখতে পাচ্ছিস তোরা চড়াই, বুলবুল – এদেরকে। ‘ডারউনের তত্ত্ব’
তো পড়েছিস তুই পাপাই, না কি?”
“হ্যাঁ, পড়েছি মানে স্যার বলেছেন... বিশদে পড়তে হবে নেক্সট ইয়ারে
পরের ক্লাসে।” সপ্রতিভ জবাব দেয় পাপাই, “‘থিওরি অফ ইভোলিউশন’, যাতে আছে - যোগ্যতমরাই বেঁচে থাকে। ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’, তাই তো দাদান?”
“হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছিস।”
এই সময়
চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে অলিন্দে আসে তিয়াশা, “এই নিন বাবা, দেরি হয়ে গেল।”
“না না দেরি হয়নি, ঠিক সময়েই এনেছ
তুমি বউমা।”
দুই
চায়ের
পেয়ালায় চুমুক দিয়েই অম্বরীশ বলেন, “চড়াইয়ের কথা যখন উঠলই, তখন এক ভয়ংকর কাহিনি মনে পড়ে গেল।”
“ভয়ংকর কাহিনি!” খুদে দুজন একযোগে
বলে ওঠে, “গল্প না সত্যি?”
“আরে - সত্যি, গল্প নয়। ঘটে যাওয়া ঘটনা। আমাদের দেশে নয়, ঘটেছিল চিনে।”
শুনবার
জন্যে উৎসুক দৃষ্টি মেলে অম্বরীশের মুখের পানে চেয়ে থাকে দু’টিতে।
“আজ থেকে ৬৫ বছর আগে মানে বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি পেরিয়ে ১৯৫৮, ‘মাও জে দং’ তখন চিনের চেয়ারম্যান। তিনি নির্দেশ জারি করলেন - দেশে যত চড়াই আছে, সব মেরে ফেলতে হবে। শুধু চড়াই পাখিই নয়, মেরে ফেলতে হবে মশা, মাছি আর ইঁদুর।”
“কেন এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান?” পাপাই জিজ্ঞেস না করে পারে না।
“কারণ, চড়াই বছরভর উৎপাদিত খাদ্যশস্যের
অনেকটাই খেয়ে ফেলে। মশা-মাছি রোগ ছড়ায় আর ইঁদুর তো প্লেগ-রোগের ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটায় মানুষের শরীরে। দেশবাসীর উদ্দেশে ‘মাও জে দং’
সদর্পে বিবৃতি দিলেন - প্রকৃতি প্রকৃতির
মতন আর মানুষ নিজের মতন। প্রকৃতিকে ইচ্ছে অনুসারে পরিচালিত করতে পারলেই মানুষের জয়যাত্রা অব্যাহত
থাকবে। এভাবেই চার
বছর ধরে নিধনযজ্ঞ চলল ১৯৬২ পর্যন্ত। তার আগেই ১৯৬০ সালেই ভয়ংকর ফেমিন মানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল
দেশজুড়ে। চাষিদের মাথায় হাত। ফসল নষ্টকারী পোকামাকড়ের দৌরাত্ম্যে খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার তলানিতে এসে ঠেকল। দেশব্যাপী না খেতে পাওয়া
মানুষের হাহাকার শুনে যখন চেতনা ফিরল দং-এর, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু
ঘটেছে...”
“কিন্তু কেন দাদান? ফসল তো বেশি থাকার
কথা,” জুলজুল চোখে অম্বরীশের মুখের
পানে চেয়ে প্রশ্ন করে মুন্নি, “চড়াই তো সব মরেছে!”
“গুড কোয়েশ্চন মুন্নিসোনা,” পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলে ওঠেন অম্বরীশ, “আসলে, দং-এর তখন কোনো ধারণাই ছিল না যে, চড়াই যত পরিমাণ খাদ্যশস্য খায়, সে-তুলনায় শস্য-বিনষ্টকারী কীটপতঙ্গ খেয়ে সাফ করে দিয়ে অনেক বেশি পরিমাণ
ফসল বাঁচায়। শুধু চড়াই-ই নয়, বুলবুল পাখির ভূমিকাও একই। আমাদের দেশে একটা গান খুব পরিচিতি লাভ করেছিল, তোরা শুনেছিস কিনা জানি না...”
“কোন গান দাদান?” কথার মাঝেই প্রশ্ন
করে পাপাই।
“মায়েরা সেসময় তাদের শিশুসন্তানদের যে গান গেয়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন, সে গানটা ছিল এরকম -
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এল দেশে।
বুলবুলিতে ধান
খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?
ধান ফুরুলো, পান ফুরুলো
খাজনার উপায় কী?
আর ক’টা দিন সবুর
করো
রসুন বুনেছি।
এ গান তোরা
শুনবি কেমন করে? আজকাল মুঠোফোনে কত রকমের গান
শুনিস তোরা, তার মধ্যে এ গান নেই।” দীর্ঘশ্বাস ফেলেন অম্বরীশ, “বড়ো হয়ে পড়িস, দেশের ইতিহাস জানবি না? ইতিহাস মানুষকে ভবিষ্যতে ঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।”
“‘খাজনা দেব কিসে?’ - মানে কী দাদান?” প্রশ্ন করে মুন্নি, “আর ‘বর্গী’ কী, তাও বুঝলাম না।”
“সেই সময় মহারাষ্ট্র থেকে একদল দস্যু এসে লুঠতরাজ করত, ওদেরকেই বলত বর্গী। আর জমিদারের পেয়াদারা বাড়ি বাড়ি যেত জমির জন্যে টাকা আদায়
করতে। সেই পরিমাণ
টাকাই হল খাজনা, যাকে তোরা এখন বলিস ট্যাক্স। সে খাজনাও দিতে পারত না গরিব
মানুষজন, কারণ - বুলবুলিতে ধান খেয়ে যাওয়ার দরুন তাদের ভাতই জোটেনি, তাই বলছে - খাজনা দেব কিসে?”
“তারপরে চিনে কী হল দাদান, বললেই না!” মৃদু অনুযোগ পাপাইয়ের কণ্ঠে।
“হ্যাঁ, তারপর চিনকে কী করতে হয়েছিল
জানিস?”
“কী দাদান?”
“রাশিয়া থেকে কয়েক লক্ষ চড়াই পাখি আমদানি করতে হয়েছিল। আসলে, চড়াই ফসল বিনষ্টকারী পোকামাকড়ই শুধু খায় না,
locust মানে পঙ্গপাল-এর হানা থেকেও ফসল বাঁচায়।”
“পঙ্গপাল কী দাদান?” চোখ বড়ো বড়ো করে
প্রশ্ন করে মুন্নি।
“পঙ্গপালও পরিযায়ী ফড়িং মানে পোকা বা পতঙ্গ। অন্য ফড়িংদের সঙ্গে তফাত - এরা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে পারে।”
“পঙ্গপালকে চড়াই আটকায় কীভাবে?” পাপাইয়ের প্রশ্ন।
“একইভাবে। পঙ্গপালকে
চড়াই খেয়ে সাফ করে। তবে, একসঙ্গে দলবেঁধে লক্ষ লক্ষ পঙ্গপাল হানা দেয় তো... তাই, সবগুলোকে চট করে নিকেশ করতে না পারলেও বেশ কিছুসংখ্যক মরে
চড়াইয়ের আক্রমণে। আসলে কী
জানিস মুন্নি-পাপাই, প্রকৃতির ভারসাম্য বিঘ্নিত হলেই বিপদ। সব প্রাণী ও কীটপতঙ্গদেরই বেঁচে থাকা
জরুরি। প্রত্যেকের
কোনো না কোনো ভূমিকা রয়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়, এটাই মোদ্দা কথা।”
অম্বরীশের
কথা শেষ হওয়ার মুহূর্তে চার-পাঁচটা শালিক ঝগড়া করতে করতে অলিন্দের সামনের
প্রাঙ্গণে নেমে আসে কিছু একটা দেখতে পেয়ে। নীচে তাকাতেই চোখে পড়ে বিরাট এক দাঁড়াশ সাপ। ছুটির দিনে একদল ছেলে জটলা
থেকে বেরিয়ে এসে লাঠির খোঁজ করতেই অম্বরীশ দ্রুত নীচে নেমে গিয়ে তাদেরকে আটকান, “সাপটাকে মেরো না তোমরা লক্ষ্মীছেলেরা আমার। দাঁড়াশ সাপ বিষাক্ত নয়, আর জানো তো মেঠো ইঁদুর এদের প্রধান খাদ্য। এরা না থাকলে ইঁদুরের সংখ্যা
খুব বেড়ে যাবে, সেটা কি ভালো হবে?”
তরুণের দল
অম্বরীশকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। তারা একযোগে বলে ওঠে, “ঠিক আছে জেঠু - তুমি যখন বলছ, লাঠি আনতে যাচ্ছি
না আমরা।”
বলতে বলতে
ছেলেরা চলে গেল। অম্বরীশ
ফিরে এসে পাপাই-মুন্নিকে বললেন, “এ বছর বর্ষাকাল এলেই তোরা কী করবি, মনে আছে তো? এর মধ্যে কবে যেন বলেছিলাম...”
“হ্যাঁ দাদান, মনে আছে - অনেক অনেক গাছের চারা কিনে এনে লাগাব আমাদের বাগানে।”
----------
ছবি - সুজাতা চ্যাটার্জী
No comments:
Post a Comment