
অনিমেষ আর
সেই লোকটা
অমর্ত্য
বন্দ্যোপাধ্যায়
অনিমেষের কোনোকিছুই ভালো
লাগছিল না। না হয় সে টিউশনের ইতিহাস পরীক্ষায় একটু কম নম্বর পেয়েইছে, কিন্তু তাই
বলে এই ক্লাস নাইনে এসেও মা অমনি করে ছোটো ভাইটার সামনে সটান তার কান মুলে দেবেন।
ভারী অপমানবোধ হচ্ছিল অনিমেষের। মনখারাপ হলে তাই সে শহিদ মিনারের তলাকার এই
জায়গাটায় এসে বসে থাকে। যদিও জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি, ওপার থেকেই তো বাসস্ট্যান্ডের
হল্লাগুল্লা শুরু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এপাশটা তবু কিছুটা হলেও শান্ত। এর পিছনেই
ময়দান চলে গিয়েছে দিগন্ত অভিমুখে। ওদের বাড়িটা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে। অনেকে
বিশ্বাসই করতে চায় না। লম্বা সুরেন ব্যানার্জী রোডের দু-পাশে যে গলি, তস্য গলিগুলো
রয়েছে – তারই একটাতে বিশাল পুরোনো এক ঝুপসি লাল ইটের বাড়ির একতলাটা জুড়ে ওদের সংসার।
দোতলাটা ক্রমেই বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অনিমেষের
বাবা সাধারণ একটা চাকরি করেন। অত বড়ো বাড়িটাকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার মতো সামর্থ্য
নেই তাঁর। কিন্তু অনিমেষ কখনও সেসব টের পায়নি। সে তার ভাই, মা আর বাবাকে নিয়ে বড়ো
সুখেই দিন কাটাচ্ছে। মাঝে মাঝে খুব সাহস করে, বাবা বাড়িতে না থাকলে, মা ভাইকে নিয়ে
পড়াতে ব্যস্ত থাকলে, অনিমেষ চুপিচুপি দোতলার সিঁড়ির সামনেটায় গিয়ে দাঁড়ায়। উপরে
ওঠা বারণ বলে সিঁড়ির সামনেটায় একটা তারের গেট লাগিয়ে দিয়ে তাতে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু অনিমেষ যেন টের পায় উপরতলাকার ঘরগুলো কীসের যেন এক আকর্ষণে তাকে অদ্ভুত
শক্তিতে টেনে ধরেছে। অনিমেষ সেই অজানা শক্তিটাকে অনুভব করে।
আজও অনিমেষ শহিদ মিনারের
তলাকার সেই বেঞ্চিগুলোর একটাতে এসে বসেছিল। সময়টা নভেম্বরের মাঝামাঝি। অল্প অল্প
শীতের আমেজ পড়তে শুরু করেছে। একেবারে পাতলা জামা পরে থাকলে গায়ে ঠান্ডা লাগে।
অনিমেষ তাই একটা মোটা টি-শার্ট পরেই বেরিয়েছে। মনটা তার কেমন যেন উদাস হয়ে
যাচ্ছিল। কোনোকিছুই ভালো লাগছিল না। এমন সময় চকিতে প্রশ্নটা শুনেই সে পাশ ফিরে
তাকাল, “পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছ বলে বুঝি মনখারাপ ?” হঠাৎ অনিমেষের মনে হল যেন একটা
খুব শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। লোকটার বয়স বেশি না। তিরিশ-পঁয়ত্রিশের
কোঠায়। হয়তো বা দাদা বলেই ডাকতে পারে অনিমেষ। কিন্তু তার পোশাকটা কেমন জানি অদ্ভুত।
ধুতি আর শার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এই বয়সের একটা লোক, কলকাতায় এমনটা আজকাল আর
প্রায় দেখাই যায় না। মাথার চুলটাও কেমন জানি পেতে পরিপাটি করে আঁচড়ানো। অনিমেষের
মনে হচ্ছিল যেন লোকটা স্বয়ং তাদের ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা একটা চরিত্র।
কেন অনিমেষের এমনটা মনে হচ্ছিল একথা সে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। কিন্তু চারপাশ
তাকিয়ে অনিমেষ দেখল তাদের বসে থাকার জায়গাটা কেমন জানি আরও নিঃঝুম আর নিঃস্তব্ধ
হয়ে পড়েছে। আশেপাশে আর কোনো লোকজন বা ফেরিওয়ালাদেরও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
অনিমেষের একটু একটু ভয় করছিল এবার। লোকটা আবার জিজ্ঞেস করল, “জবাব দিচ্ছ না যে?”
অনিমেষ আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়ল। লোকটা মুচকি হেসে বলল, “ইতিহাস কি কেবলই মুখস্থ করতে
হয়? ইতিহাস যে উপলব্ধির জিনিস।” অনিমেষ ভ্রূ কুঁচকিয়ে তাকাল, “ইতিহাস আবার উপলব্ধি
করব কী করে ?” লোকটা তীব্র দৃষ্টিতে অনিমেষের দিকে একঝলক তাকিয়েই চট করে বলে উঠল,
“কেন! এইভাবে!” অনিমেষের মাথাটাও ঠিক তখনই যেন চড়াৎ করে ঘুরে গেল একটিবার।
চারপাশটায় আবারও ভালোভাবে তাকিয়ে সে দেখল তার চেনা সমস্ত শহরটাই যেন পালটিয়ে গেছে
হঠাৎ। ভোজবাজির মতোই উধাও হয়ে গেছে এসপ্ল্যানেডের
ব্যস্ত বাস টার্মিনাস। শুধু অনেক পুরোনো যে সমস্ত ইংরেজ আমলের বাড়িগুলোকে সে দেখত,
সেগুলোই যেন ফাঁকা মাঠের মধ্যেটায় দৈত্যাকার হয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। সেই কে সি দাশ
নেই, হকারদের হাঁকাহাঁকি নেই। কেবল চেনা বাড়িগুলোর মধ্যে সে দেখতে পাচ্ছে সাদা
ধবধবে এসপ্ল্যানেড ম্যানসন, ওপাশে অনেক দূরে ইডেন গার্ডেন্স আর রাজভবন। বিধানসভা
ভবন, হাইকোর্ট আর তার ঠিক পাশেই লাল বিশালাকৃতি এজি বেঙ্গল বিল্ডিং। পিছনে তাকিয়ে
সে দেখল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের চূড়োটাকে দেখা যাচ্ছে, আরও অনেক দূরে ডানদিকে
বোধহয় ফোর্ট উইলিয়াম। আকাশবাণী ভবনেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি এস এন ব্যানার্জি
রোডের দিকটাতেও তাকালে মনে হচ্ছে যেন ধু ধু এক প্রান্তর চলে গিয়েছে। শুধু মাঝে
মাঝে অনেক পুরোনো একেকটা বাড়ির চেহারা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই বাড়িগুলোকে দেখে
এখন আর মোটেই ‘পুরোনো’ বলে মনে হচ্ছে না। নিউমার্কেটের বাড়িটাও অবিশ্যি তার
অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। এরই মধ্যে সে অনুভব করল শীতে যেন তার হাড় অবধি কেঁপে
যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকাতেই সে বুঝল এখন সবে সকাল হচ্ছে। তাই এত শীত? অনিমেষ
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পাশে লোকটার দিকে তাকাল।
“আজ ১২ জানুয়ারি, ১৯২৪,”
লোকটা ফিসফিস করে অনিমেষকে বলল, “সবে তিনবছর হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরি হয়েছে;
আর তুমি যে বারবার করে ওই কে সি দাশের দোকানের দিকে তাকাচ্ছ – সেই দোকান ওখানে তৈরি
হতে কিন্তু আরও ১১ বছর।” অনিমেষ ভালো করে দু-চোখ কচলে দেখতে চেষ্টা করল। কিন্তু আশপাশটা
যেমন ছিল ঠিক তেমনই রইল। কোনো পরিবর্তন হল না। অনিমেষ কেঁদে ফেলবে কিনা ভাবছে, এমন
সময় লোকটা তার পাশে রাখা আলোয়ান না কম্বল মতো একটা জিনিস বের করে ভালো করে ওর গায়ে
জড়িয়ে দিল। তারপর বলল, “এসো, আমরা একটু হেঁটে আসি বরং।”
কনকনে শীতে ময়দানের উপর দিয়ে
হাঁটতে অনিমেষের ভালো লাগছিল। অনেক আগে ছোটোবেলায় ওর বাবা ওকে নিয়ে এভাবে ময়দানে
বেড়াতে আসতেন। তখনও ভাইয়ের জন্ম হয়নি। খুব সকালে এসে বাবা ওকে খালি পায়ে ময়দানের
ভিতর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতেন। খালি পায়ে ভোরের শিশির লাগা নাকি ভালো। যদিও অনেকের
এতে ঠান্ডা লেগে যাবার ভয় থাকে। কিন্তু অনিমেষের কোনোদিন ঠান্ডা লাগেনি। হাঁটা শেষ
হত প্রায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে। তারামণ্ডলের উলটোদিকে একটা বিহারী চায়ের
দোকান ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে বাবা চা খেতেন; আর অনিমেষের জন্য মাটির গেলাসে বড়ো এক
ভাঁড় করে দুধ বরাদ্দ ছিল। ঘন করে জ্বাল দেওয়া সেই দুধের উপরে পুরু করে সর পড়ত।
লোকটার সঙ্গে এভাবে একশো বছর আগেকার ময়দান ধরে হেঁটে যেতে যেতে এসব কথাই অনিমেষের
মনে পড়ছিল। লোকটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “তুমি টেগার্টের নাম শুনেছ?” অনিমেষের নিজেকে
আবারও সেই পরীক্ষায় পড়া না পারা ছাত্রের মতোই মনে হচ্ছিল। কাঁচুমাচু
মুখে সে লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা যেন একটু রাগী রাগী দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে
জবাব দিল, “কেমন ছেলে তুমি, ক্লাস নাইনে পড়ছ অথচ চার্লস টেগার্টের নাম শোনোনি?” অনিমেষ
মাথা নীচু করল। নামটা ভীষণ শোনা শোনা লাগছে। এমন সময়
দূরে ময়দানের উপর একসার গোরা সেপাইকে তালে তালে কুচকাওয়াজ করে যেতে দেখতেই ওর মস্তিষ্কে
যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। “কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন চার্লস টেগার্ট! বাংলার
বিপ্লবীরা সবাই ওঁর উপরে খুব রেগে গিয়েছিল, এতটাই অত্যাচার করতেন,” এক নাগাড়ে গড়গড়
করে বলে গেল অনিমেষ। লোকটা মুখ টিপে হাসল একবার। চারপাশটা কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন
লাগছে।
“চার্লস টেগার্ট, আদতে
আইরিশম্যান। কলকাতার দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ কমিশনার। ভারত-ইতিহাসের পাতায়
চিরকুখ্যাত হয়ে বিরাজমান,” লোকটা টেগার্টের সম্পর্কে বলতে শুরু করেছে, “১৯০১ সালে
টেগার্ট কলকাতা পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, এবং তার
পরে পরেই ক্রমশ স্বদেশী আন্দোলন থেকে বিস্তার লাভ করে বাংলায় বিপ্লবী কার্যকলাপের সূচনা।
কলকাতা সহ গোটা বাংলা তখন বিপ্লবের আগুনে ফুটছে। তাজা রক্তের সমস্ত কিশোর-যুবকেরা
তখন দলে দলে অনুশীলন সমিতিতে নাম লেখাচ্ছে। অত্যাচারী সাহেবরা সকলেই ব্যতিব্যস্ত
হয়ে উঠেছেন; আর অন্যদিকে বিপ্লবীদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন এই চার্লস টেগার্ট। একবার
কোনোভাবে বিপ্লবী বলে সন্দেহ হলে পরেই, বেপরোয়া কিশোর-যুবক-তরতাজা সমস্ত জোয়ান
ছেলেদের তিনি সরাসরি আটক করে লালবাজারে তুলে আনতেন। তারপর
শুরু হত অত্যাচার। একদিকে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড, অন্যদিকে পুলিস কমিশনার টেগার্ট।
এই দুজনের অত্যাচারের কত কাহিনীই যে সারা বাংলা জুড়ে বিপ্লবীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে
পড়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। শেষমেশ তাই টেগার্টকেই নিশানা করল বাংলার বিপ্লবী সমাজ,”
লোকটা অনিমেষের মুখের দিকে তাকাল, “তারিখটা যেন ভুলে যেও না, ১২ জানুয়ারি ১৯২৪। নববর্ষ
কেটেছে দু-সপ্তাহও হয়নি। তখন কিড স্ট্রিটে নিজের বাংলো থেকে টেগার্ট এই সময়
প্রত্যহ ময়দানে প্রাতঃভ্রমণে আসতেন। সেই সময় টেগার্ট নিজের দেহরক্ষীদেরকেও নিজের
সঙ্গে আসতে দিতেন না। বাংলার বিপ্লবীরা ঠিক করলেন এই প্রাতঃভ্রমণের সময়টাই হবে সেই
মাহেন্দ্রক্ষণ। টেগার্টের অন্তিম পরোয়ানা লিখতে হবে এই সুযোগকে ব্যবহার করেই।”
হাঁটতে হাঁটতে ওরা প্রায়
ময়দানের মাঝখানটাতে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন যেখানে ময়দান মেট্রো স্টেশন উঠেছে, প্রায়
সেইখানেই। অনিমেষ লক্ষ্য করল ময়দানের প্রান্ত বেয়ে যে গাছের সারিটা চলে গেছে তারই
একটা গাছের আড়ালে চুপিসারে গুঁড়ি মেরে একটা লোক বসে আছে। পরনে অনিমেষের সঙ্গের
লোকটার মতোই একটা সাধারণ ধুতি আর হাতা-গোটানো শার্ট, ময়লা রং। পেটের কাছটা কেমন
জানি অদ্ভুতভাবে উঁচু হয়ে রয়েছে লোকটার। অনিমেষের সঙ্গের লোকটা ফিসফিস করে ওর কানে
কানে বলল, “রিভলবার। ...ওর নাম গোপীনাথ। গোপীনাথ সাহা। ইতিহাসে পড়নি ওর বিষয়ে?”
অনিমেষের একটু একটু করে মনে পড়ছিল। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যার চেষ্টার
অপরাধে ফাঁসি হয়েছিল বিপ্লবী গোপীনাথ সাহার। জেল থেকে নিজের মাকে লেখা শেষ চিঠিতে
গোপীনাথ লিখেছিলেন, “ঘরে ঘরে যেন প্রত্যেক মায়ের কোলে আমার মতো সন্তানের জন্ম হয়!”
ইতিহাস স্যার যখন এগুলো পড়াতেন, কই তখন তো এমন করে গায়ে কাঁটা দিত না অনিমেষের।
এখন যে সে স্বচক্ষে সেই গোপীনাথকে দেখতে পাচ্ছে। একশো বছর আগেকার কলকাতায়। গোরা
সাহেব একজন চৌরঙ্গী রোড থেকে নেমে, যার এখনকার নাম জওহরলাল নেহরু রোড, সোজা
অনিমেষদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। গোপীনাথ আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। চুপিসারে সে সাহেবের
পিছনে পিছনে এগিয়ে আসছে। অথচ অনিমেষ আর তার পাশের লোকটাকে কেউ যেন খেয়ালই করছে না।
অবাক লাগছিল অনিমেষের। কনকনে ঠান্ডা একটা হাওয়ার ঝলক, তারপরেই ঘটনাটা ঘটল।
কানফাটানো গুলির শব্দে ময়দান কেঁপে উঠেছে। সাহেবের দেহটা সামনের দিকে মুখ থুবড়ে
পড়ে গেল। গোপীনাথ সটান দৌড়ে এসেছে ওদের দিকটাতেই। অনিমেষকে যেন দেখতেই পায়নি
এমনভাবে সে ওর সঙ্গের লোকটার হাতে একটা পুঁটলি তুলে দিল। “পারলে বাড়িতে পাঠিয়ে
দিও, আমি চললাম,” দৌড়োতে দৌড়োতে ময়দান পেরুচ্ছে গোপীনাথ। ওদিকে গুলির শব্দ শুনে
লালপাগড়িধারী পুলিশেরাও দু-একজন করে ছুটে আসতে শুরু করেছে। কোথা থেকে যেন একজন
গোরা সার্জেন্টও চলে এসেছে। অনেক লোকজন
এখন ময়দানে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কেউ ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে না। গোরা সাহেবটা বোধহয় সুদূরে
সেই গোপীনাথের অপসৃয়মান চেহারাটাকে এতক্ষণে লক্ষ করল। সে চিৎকার করে কীসব যেন
হুকুম দিচ্ছে। অনিমেষের পাশের লোকটা অনিমেষের কাঁধে হাত রেখে বলল, “এবার যে আমাদের
যেতে হবে অনিমেষ।” হু হু হাওয়াতে আর কুয়াশাতে হঠাৎ অনিমেষের
চারদিকটাই যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে গেল। খানিক পরে অনিমেষ দেখল ওরা ডালহৌসি
স্কোয়্যারে দাঁড়িয়ে।
লালদিঘির পাশটায় ওরা
দাঁড়িয়েছিল। অনিমেষের আচ্ছন্ন ভাবটা তখনও কাটেনি। ওর পাশের লোকটা ফিসফিস করে ওর
কানে কানে বলে উঠল, “পয়লা মার্চ, ১৯২৪ – প্রেসিডেন্সি জেলে বিপ্লবী গোপীনাথ সাহা
ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করেন। ঠিক ছিল গোপীনাথের শেষযাত্রাতে শোকমিছিলে পা মেলাবেন
স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র ও শহরের আরও অন্যান্য অনেক বিশিষ্ট মানুষজন।
ব্রিটিশ পুলিশ তাই গোপীনাথের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করে। জেলের
ভিতরেই তার অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হয়।” লোকটা কাঁধ থেকে গোপীনাথের দেওয়া পুঁটলিটা
পাশে মাটির উপরে নামিয়ে রাখল। হাঁটু গেড়ে বসে, সেটা খুলে দেখল তার ভিতরে রয়েছে
দুটো ছোটো ছোটো বই আর একটা হাতে লেখা চিঠি। অনিমেষ আড়চোখে দেখল বইদুটোর উপরে নাম
লেখা রয়েছে, ‘শ্রীমদ্ভাগবত’ আর ‘আনন্দমঠ’। বইদুটোকে তার চিনতে অসুবিধে হল না। এই
নামের বই তো সে তার নিজের বাড়িতেও দেখেছে। অনিমেষের ঠাকুরদার বই ছিল সেগুলো। লোকটা
আবার পুঁটলিটাকে গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। “দুঃখ একটাই,” সে বলে উঠল, “গোপীনাথ
টেগার্টকে হত্যা করতে পারেনি। তার গুলিতে নিহত হয়েছিলেন কিলবার্ন কোম্পানির এক বড়োকর্তা
আর্নেস্ট ডে। টেগার্টের পরিবর্তে একজন সৎ নিরীহ সাহেবকে হত্যা করার জন্য শেষ অবধি
গোপীনাথ চরম অনুশোচনায় ভুগেছিল।” লোকটার
গলা ধরে আসছিল, “এভাবেই তো কলকাতার ইতিহাসকে উপলব্ধি করতে হয় অনিমেষ!”
অনিমেষ অবাক হয়ে দেখছিল, ওর
চোখের সামনে লোকটার যেন বয়স বেড়ে যাচ্ছে। মুখের আদলটা সামান্য সামান্য করে পালটিয়ে
যাচ্ছে। মাথায় দু-চারটি করে চুল পেকে উঠছে। “১৯৩৫, নবীন চন্দ্র দাশের পুত্র কে সি
দাশের পৌত্র সারদাচরণ ধর্মতলার মোড়ে তোমাদের ওই কে সি দাশের নামাঙ্কিত দোকানখানি
খুলেছিলেন। কিন্তু এ ইতিহাস তারও পাঁচ বছর আগের। ২৫ আগস্ট, ১৯৩০ – এই ডালহৌসি
স্কোয়্যারেই আবার কমিশনার চার্লস টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়া হয়। ধুরন্ধর
টেগার্ট সেই আক্রমণকে আগে থাকতেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন। সটান তিনি গাড়ি থেকে লাফ
দিয়ে নেমে পড়েন, এবং এক গুলিতে সেদিন তিনি ঘায়েল করেছিলেন সেই বিপ্লবী তরুণকে।
ইতিহাস অবশ্য তার নাম মনে রাখেনি। সেদিনও,” লোকটার গলা কেমন ফ্যাসফেসে শোনাচ্ছে,
“সেদিনও, আমি এইরকম একটা পুঁটলি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ওরা যে যাবার আগে ওদের
শেষ চিঠিগুলো আমার হাতেই দিয়ে যেত সবসময়। অথচ
আমি, সেগুলোকে পৌঁছিয়ে দিতে পারিনি। ওদের বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিতে পারিনি,” লোকটার দু-চোখে
জল। অনিমেষ কী করে লোকটাকে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। ইতিহাসের দু-দুটো এমন
মুহূর্তের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকা... অনিমেষ অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে,
“সেই চিঠি আর বইগুলো আপনার কাছেই রাখা ছিল?” “শেষদিন অবধি। গোপীনাথের দুটি বই আর
একখানি চিঠি, আর সেই অনামা বিপ্লবী, তার নাম ছিল নরেশ। সেই নরেশের একখানি চিঠি।
আমি দুটো চিঠিকেই ‘আনন্দমঠ’-এর ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিলাম, তারপর...” অনিমেষের
চারপাশটা কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে আসছে, “আমরা কি আবার ভবিষ্যতে ফিরে যাচ্ছি?” সে চিৎকার
করে বলে ওঠে। ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসে না। অনিমেষ দ্বিগুণ জোরে বলে ওঠে, “আপনার
নাম? আপনার নামটা বলে যাবেন না?” অনেকদূর থেকে সে যেন শোঁ শোঁ হাওয়ার গর্জনের ভিতর
দিয়ে শুনতে পায়, “আমার নাম সমীর, সমীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার ছেলের
নাম...” অনিমেষ সেই হাওয়ার গর্জনকে ছাপিয়ে আর কোনোকিছুই শুনতে পায় না। সংবিৎ ফিরতে
চারপাশে তাকিয়ে সে দেখল, সে তার বাড়ির সামনেটায় ফিরে এসেছে।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত।
কিন্তু সেদিন রাত্তিরে কীসের যেন চিন্তা করতে করতে অনিমেষ খুব ইতস্তত করে অবশেষে
ওর বাবাকে গিয়ে সমস্ত ঘটনাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ খুলে বলেছিল। ওর বাবা অবিশ্যি সেই সব
গল্পকে প্রথমটায় বিশ্বাস করতে চাননি। পরে ছেলের কথায় কী মনে করে তিনি পুরোনো
সিন্দুক খুলে অনিমেষের ঠাকুরদাদার সম্পত্তি সেই বই দুটোকে বের করে এনেছিলেন। বই দুটোর
উপরে কোনো নাম সই ছিল না। থাকলেও সে এতদিনকার টানাপোড়েনে ধুলোতেই ধুয়েমুছে গেছে।
বইদুটোর ভিতর থেকে দুটো ঝুরঝুরে পাতা আবিষ্কৃত হয়েছিল। সেগুলোও পড়বার মতো অবস্থায়
ছিল না। কোনোভাবে পোকা ধরে গিয়ে বই আর কাগজদুটোর কোনো অস্তিত্বকেই আর তারা আস্ত
রাখেনি। অনিমেষের বাবা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনিমেষকে সেদিন রাত্তিরে শেষ অবধি ঘুমোতে
পাঠিয়ে ছিলেন। সেদিনের পর থেকে আর কোনোদিন অনিমেষ ইতিহাস পরীক্ষায় কম নম্বর পায়নি;
আর সেদিনই অনিমেষ জানতে পেরেছিল সমীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রপিতামহের
নাম।
----------
ছবি - সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
No comments:
Post a Comment